কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের শতবর্ষী সীমানাপ্রাচীরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে নতুন প্রাচীর নির্মাণকে কেন্দ্র করে নগরবাসীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ইতিমধ্যে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। সচেতন নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করছে, ফুলবাগান নষ্ট করা এবং মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে প্রাচীর নির্মাণ চলবে না। তারা প্রাচীর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে প্রাচীর নির্মাণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মহাসড়কের পাশে নির্মাণকাজের কারণে পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে নাগরিক সুবিধা ও শহরের নান্দনিক সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই অবস্থায় নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার দাবিতে আজ মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুর ১২টায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সামনে ও নির্মাণাধীন প্রাচীরের পাশে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে মানববন্ধন হয়। এতে রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সুশীল সমাজসহ নগরবাসী অংশ নেয়।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মাসুক আলতাফ চৌধুরী। বক্তব্য দেন কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উৎবাতুল বারী আবু, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আমিরুজ্জামান আমীর, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু, মহানগর বিএনপি নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার, এবি পাটির জেলা সভাপতি মিয়া মোহাম্মদ তৌফিক, ব্যবসায়ী নেতা আব্দুর রহমান, কুমিল্লা বাঁচাও মঞ্চের কুমিল্লা মহানগরীর সদস্যসচিব নাসির উদ্দিন, ঐতিহ্য কুমিল্লার পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল, জেলা যুবদলের সদস্যসচিব ফরিদ উদ্দন শিবলু, অ্যাডভোকেট সুবীর নন্দি, নাট্যশিল্পী শাহাজাহন চৌধুরীসহ অন্যরা।
মানববন্ধনের শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয় এবং গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে দেখা করে কাজ বন্ধ রাখার দাবি জানানো হয়। এর আগে জেলা প্রশাসক, কারা কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, নগরীর প্রধান সড়ক সংকুচিত না করে এবং ফুলবাগান নষ্ট না করে আগের সীমানায় প্রাচীর নির্মাণ করা হোক। তাঁরা আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কাজ বন্ধ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি নেবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, কুমিল্লা শহর ঐতিহ্যবাহী ও পরিচ্ছন্ন হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ-পূর্ব অংশে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের উদ্যোগে স্থাপিত ফুলের বাগান দীর্ঘদিন ধরে নগরবাসীর জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে। কিন্তু নতুন প্রাচীর নির্মাণে ফুলের বাগান বিনষ্ট হয়েছে এবং প্রধান সড়কের প্রশস্ততা কমেছে।
সচেতন নাগরিক সমাজের নেতারা বলেন, পরিবেশ ও জনস্বার্থবিরোধী এই নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকলে কুমিল্লাবাসী অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই তাঁরা জোর দাবি করেছেন—অবিলম্বে নির্মাণ বন্ধ করে আগের অবস্থায় প্রাচীর ফিরিয়ে আনতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা উল্লেখ করেন, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড কুমিল্লার হাজার বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী। এটি আধুনিক নাগরিক জীবনের সঙ্গে মিশে শহরের প্রধান অভ্যন্তরীণ সংযোগ সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একসময় এটি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সঙ্গে দেশের অন্য অংশের একমাত্র সংযোগ পথ ছিল।
সামাজিক সংগঠন ঐতিহ্য কুমিল্লার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, ‘জেল কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের ফলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড সংকুচিত হচ্ছে। কুমিল্লাকে বিভাগ হিসেবে বাস্তবায়নের জন্য যে প্রশস্ত রাস্তা প্রয়োজন, এটি তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমরা দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চাই।’
কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, কারাগারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ছিল প্রাচীর রাস্তার চার ফুট দূরে সরিয়ে নির্মাণ করা, তবে সিটি করপোরেশন ও স্থানীয়রা বাধা দিয়েছিল। বিষয়টি সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।’
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক বলেন, ‘নতুন প্রাচীরের কারণে স্থানীয়রা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আমরা সিটি করপোরেশন ও সড়ক বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করেছি। সিটি করপোরেশন জেল কর্তৃপক্ষকে পথচারীদের চলাচল, পানি নিষ্কাশনের নালা রাখার জন্য ৫-৭ ফুট জায়গা রেখে প্রাচীর নির্মাণ করার জন্য বলেছিল। আমরা বিষয়টি নিয়ে আবার বসব।’
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শাহ আলমের অভিযোগ, জেল সুপার সিটি করপোরেশনকে অবহিত না করে কাজ শুরু করেছেন। প্রাচীর রাস্তার একদম কাছে হওয়ায় কোনো ফুটপাত রাখা হয়নি, যা পথচারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁদের ৫-৭ ফুট জায়গা ছেড়ে তা করার জন্য বলেছিলাম, কিন্ত তাঁরা তা মানেননি।’