চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারার প্রতিবাদে শ্রমিকেরা পঞ্চম দিনের মতো লাগাতার কর্মবিরতি পালন করেছেন। তাঁদের এ কর্মসূচির কারণে বন্দরে সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে বহির্নোঙরে তৈরি হয়েছে জাহাজজট। শতাধিক মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) পণ্য নিয়ে সাগরে ভাসছে। ২১টি অফ-ডকে রপ্তানিমুখী কনটেইনার জমা হচ্ছে।
বন্দরের পরিসংখ্যান বলছে, ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল পর্যন্ত বন্দরে মোট ১১৫টি বড় জাহাজ ছিল। এগুলোর মধ্যে ৯৬টি জাহাজ বহির্নোঙরে এবং বন্দরের মেইন জেটিতে ১৪টি জাহাজ ছিল। এ ছাড়া বন্দরের মোট ৫৯ হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতা রয়েছে; এর মধ্যে ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৩০৭টি কনটেইনার জমা হয়েছে।
মাসখানেক ধরে লাইটার জাহাজ সংকটে পণ্য খালাস ব্যাহত হয়ে বহির্নোঙরে এখনো স্মরণকালের সবচেয়ে মারাত্মক জাহাজজট চলছে। এতে আসন্ন রমজানে ভোগ্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্দরের কর্মকর্তা জানান, সাধারণত বন্দরে ৩০ থেকে ৩৫টি জাহাজ অপেক্ষায় থাকে। বন্দরে অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোর মধ্যে ১২টি কনটেইনার জাহাজ, ২৯টি সাধারণ পণ্যের, ২২টি খাদ্যশস্যবাহী ও ৫টি চিনির জাহাজ রয়েছে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরে না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। শ্রমিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন।’
সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে বন্দরের মূল তিনটি টার্মিনাল থেকে কোনো জাহাজ ছেড়ে যায়নি। কোনো জাহাজও জেটিতে ভেড়ানো যায়নি। বুধবার সকালে জোয়ার শুরুর পর দুপুর পর্যন্ত কোনো জাহাজ আনা-নেওয়া হয়নি। জেটিতে কনটেইনারবাহী ১০টি জাহাজ আটকে আছে। কনটেইনারবিহীন পণ্যবাহী তিনটি জাহাজও আটকা। জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানো যেমন বন্ধ, তেমনি রপ্তানি পণ্যবাহী কোনো কনটেইনার বন্দরে ঢোকেনি। আমদানি পণ্যও খালাস হয়নি।
আন্দোলনকারীরা জানান, ২ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ১৫ জন শ্রমিককে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে বদলি করা হয়। তাঁদের মধ্যে আটজনকে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে এবং ৭ জনকে মোংলা বন্দরে বদলি করা হয়। এতে আন্দোলনের মাত্রা আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেন শ্রমিকেরা।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, বুধবার সকাল থেকে বন্দরের জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানো বন্ধ থাকায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এদিন ২১টি ডিপোতে ১০ হাজার ৮১৭ রপ্তানি কনটেইনার জমা হয়েছে।
বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সভা
বন্দরের চলমান সংকট নিয়ে বুধবার দুপুর থেকে সন্ধা পর্যন্ত বন্দরের শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে বিজিএমইএ, বিকেএমই, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, পোর্ট ইউজারস ফোরামেরসহ বিভিন্ন সংগঠন সভা করে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ হোটেলে অনুষ্ঠিত সভায় বন্দরে চলমান আন্দোলনকে শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন বলে সংহতি প্রকাশ করা হয়। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম জানান, বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনে সংহতি প্রকাশের ঘোষণা আসতে পারে।
শুনানি ৯ ফেব্রুয়ারি
এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি-সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে জারি করা রুল খারিজ করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল শুনানি ৯ ফেব্রুয়ারি। আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব গত মঙ্গলবার এই আদেশ দেন। ওই দিন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এই বিষয়ে শুনানি হবে।
গত ২৯ জানুয়ারি হাইকোর্টের একক বেঞ্চ চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি-সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে জারি করা রুল খারিজ করে রায় দেন।
রায়ে বলা হয়, যে প্রক্রিয়ায় কার্যক্রম এগোচ্ছে, তা ২০১৭ সালের প্রকিউরমেন্ট পলিসি ও সমঝোতা স্মারকের অধীনে। পলিসিতে কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরাসরি বাছাই বা নির্বাচন করার সুযোগ আছে। কাউকে এখনো কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। তাই রিট অপরিপক্ব।