বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বাঙ্গালী ও করতোয়া নদী। একসময় এই দুই নদী ছিল স্থানীয় জেলেদের জীবিকার প্রধান উৎস। বর্ষা মৌসুমে এখনো কিছুটা মাছ পাওয়া যায়। তবে শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলো পরিণত হয় মরা খালে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এই নদী দুটি হয়তো ধীরে ধীরে পুরোপুরি মরে যাবে।
শেরপুর উপজেলার প্রধান দুটি নদী হলো বাঙ্গালী ও করতোয়া। উজান থেকে বয়ে আসা নদী দুটি শেরপুর উপজেলার কল্যাণী ঘাট এলাকায় বাঙ্গালী নদীর সঙ্গে মিলেছে। অন্যদিকে বাঙ্গালী নদীর উৎপত্তি গাইবান্ধার আলাই নদ থেকে। এটিও শেরপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় গিয়ে ‘ফুলজোড়’ নাম ধারণ করে হুরাসাগরে গিয়ে মিশেছে।
একসময়ের প্রমত্তা করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী এখন অনেক জায়গায় সরু, নাব্যতাহীন এবং দূষিত জলধারায় পরিণত হয়েছে। কোথাও কোথাও নদীর প্রস্থ এতটাই কমে গেছে যে শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যায়। উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আলম প্রামাণিক বলেন, আগে নদীতে বড় বড় নৌকা চলত, এখন আর সেসব নেই। শুকনো মৌসুমে হেঁটে নদী পার হওয়া যায়।
শেরপুর পৌরসভা এলাকায় বসবাসকারী লক্ষাধিক মানুষের গৃহস্থালি, পয়োনিষ্কাশনের ড্রেন গিয়ে মিশেছে করতোয়ায়। এমনকি কিছু জায়গায় সরাসরি আবর্জনা ফেলে নদীর অংশবিশেষ ভরাট করার অভিযোগও রয়েছে পৌরসভার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া স্থানীয় দই-মিষ্টির কারখানা, রেস্তোরাঁ, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বর্জ্যও করতোয়ায় গিয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে নদীর পানি ক্রমেই দূষিত হয়ে উঠছে।
পৌর শহরের উত্তর সাহাপাড়া এলাকার আশুতোষ সরকার বলেন, ‘দই-মিষ্টির কারখানার বর্জ্য, ড্রেনের পানি মিলিয়ে করতোয়ার পানি এখন মারাত্মকভাবে দূষিত। কয়েক মাস আগে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই বারুণীঘাট এলাকায় নদীতে মাছ ছাড়া হয়েছিল। কিন্তু পরের দিনই সেগুলো মরে ভেসে ওঠে।’
বারদুয়ারী হাট এলাকার বাসিন্দা আকরাম শেখ বলেন, অতীতে করতোয়া নদী ছিল এলাকার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। তিনি বলেন, ‘আগে করতোয়া নদী দিয়ে গবাদিপশু, ধান, মাটির হাঁড়িপাতিল, নারকেলবোঝাই নৌকা আসত। এখন পৌরসভা আবর্জনা ফেলে নদীর অনেক জায়গা ভরাট করে ফেলেছে। ফলে সেসব নৌকা আর চলতে পারে না।’
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, শেরপুরের এসআর কেমিক্যাল লিমিটেড এবং মজুমদার প্রোডাক্টস নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি করতোয়া ও বাঙ্গালী নদীতে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এর ফলে শুধু এই দুটি নদী নয়, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় প্রবাহিত ফুলজোড়ের পানিও দূষিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে রায়গঞ্জ এলাকার কিছু মানুষ আন্দোলনও করছেন বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।
মজুমদার প্রোডাক্টসের এইচআর অ্যাডমিন রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা ইটিপিতে পরিশোধন করার পরেই পাইপলাইনের মাধ্যমে বাঙ্গালী নদীতে পানি ফেলি। এতে নদীদূষণ হওয়ার কথা নয়।’
অন্যদিকে এসআর কেমিক্যাল লিমিটেডের কেমিস্ট ফারুখ আকন্দ বলেন, ‘আমাদের কারখানার বেশির ভাগ বর্জ্য বিভিন্ন টেক্সটাইল ও পেপার মিলে বিক্রি করা হয়। অবশিষ্ট বর্জ্য ইটিপিতে পরিশোধন করে সেই পানি পুনর্ব্যবহার করা হয়। তাই আমাদের বিরুদ্ধে নদীতে বর্জ্য ফেলার অভিযোগ সঠিক নয়।’
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও শেরপুর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী নাব্যতাসংকট ও দূষণের কারণে এখন মৃতপ্রায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় পৌরসভাসহ সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে নদীগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’