জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে আমরা নারীদের সাহসী ভূমিকা দেখেছি, কিন্তু পরে রাষ্ট্র সংস্কার বা নীতি নির্ধারণের জায়গায় সেই উপস্থিতি ততটা দেখা যায়নি। এটি আসলে ঐতিহাসিকভাবেই হয়ে আসছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আমাদের অনেক নারীনেত্রী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু আজ আমরা কয়জন তাঁদের নাম জানি? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের বীরত্বগাথার চেয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়ার করুণ ইতিহাসকেই বেশি সামনে আনি। ‘বীরাঙ্গনা’ পরিচয় দিয়ে তাঁদের কেবল একাত্তরের সেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গল্পেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
একইভাবে নব্বইয়ের আন্দোলন কিংবা ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান—আমরা যখনই রাজপথে নামি, সেটা একধরনের অলংকারের মতো মনে করা হয়। সমাজ ভাবে—নারীরাও তো ছিল, বাহ্ খুব ভালো! কিন্তু নেতৃত্বের মূল জায়গায় তাঁদের উপস্থিতি মেনে নিতে এই সমাজ প্রস্তুত নয়। কারণ, আমাদের মনস্তত্ত্বে শক্তি মানেই পুরুষের মুখ। সেই নারী যখন রাজপথ বা কর্মক্ষেত্রে তাঁর অধিকারের দাবি নিয়ে সোচ্চার হন, সমাজ তখন তাঁকে আর ‘স্বাভাবিক নারী’ হিসেবে গ্রহণ করে না, বরং ‘অ্যাগ্রেসিভ’ তকমা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়।
জুলাই আন্দোলনের ঠিক পরপরই পাল্টে যাচ্ছে না বলে বরং যদি বলি, সব রকম বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে গণ-অভ্যুত্থান হলো, তার ঠিক পরপরই আজন্ম বৈষম্যের শিকার যে নারী, তার প্রতি একই রকমের আচরণ কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। বিশেষত যে নারীর অগ্রণী ভূমিকায় এই গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হলো, সেই নারী কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে থাকতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন তোলাটা কি খুব বেশি হতাশাজনক নয়? পলিটিক্যালি দেখলে ব্যাপারটা কিন্তু খুবই উদ্বেগজনক।
অভ্যুত্থানের পরপরই নারীরা সমাজে যে পরিমাণ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলেন, এটা তো মানবাধিকার লঙ্ঘন। দেখলাম না তো দলমত-নির্বিশেষে নারীর মর্যাদা রক্ষায় সব ভিন্নমত, ভিন্ন পেশার মানুষকে এককাতারে দাঁড়াতে। একটা নারী কমিশন হলো, তাদের নিয়ে যে একটা অশোভন আচরণ করা হলো, রাষ্ট্র তো তখনো প্রায় নিশ্চুপ ছিল!
তথ্যসূত্র: সৈকত আমীন কর্তৃক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌসের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল প্রথম আলোয় প্রকাশিত।