‘মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু যেন ভাই,/ ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই’—মায়ের হাতে বাঁধাই করা একটি ফ্রেমে লেখা এই উক্তি যেন তাঁর ভালোবাসারই প্রতিচ্ছবি।
প্রত্যেক মায়ের মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে একেকজন শিল্পীর সত্তা। সংসারের ব্যস্ততার মাঝেও তাঁরা সুই-সুতার নিপুণ কারুকাজে প্রকাশ করেন নিজেদের ভালোবাসা, যত্ন আর সৃজনশীলতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কাজ থেমে গেলেও থেকে যায় তাঁর অমলিন স্মৃতি। তেমনই এক নীরব স্মৃতির সাক্ষী হয়ে আছে আমার মায়ের ছোট্ট সংগ্রহশালা।
১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত অবসর পেলেই মা সুই-সুতা আর কাপড় নিয়ে বসে পড়তেন। ধীরে ধীরে তাঁর নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তুলতেন নানা নকশা আর ফুলের কারুকাজ। কাপড়ের ওপর ফুল সেলাই করে তা ফ্রেমে বাঁধাই করা ছিল তাঁর প্রিয় কাজ।
তাঁর হাতের স্পর্শে সেই ফুলগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠত। এগুলো শুধু ঘরের দেয়ালই সাজাত না, বরং পরিবারের আবেগ আর স্মৃতি ধারণ করে রাখত।
মায়ের তৈরি নকশিকাঁথাগুলোও ছিল অনন্য শিল্পকর্ম। প্রতিটি সেলাইয়ে রয়েছে ধৈর্য, যত্ন আর ভালোবাসার ছোঁয়া। এই কাঁথাগুলো শুধু ব্যবহারিক জিনিস নয়, বরং তাঁর সৃজনশীলতার এক জীবন্ত নিদর্শন। শীতের রাতে সেই কাঁথা যেমন উষ্ণতা দিত, তেমনি মনে করাত মায়ের অগাধ মমতার কথাও।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসারের দায়িত্ব, ব্যস্ততা আর বয়সের কারণে মা এখন আর আগের মতো এসব কাজ করতে পারেন না। তবু তিনি খুব যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করে রেখেছেন তাঁর তৈরি সেই ফ্রেম আর নকশিকাঁথাগুলো। ঘরের দেয়ালে দেয়ালে ঝুলে থাকা সেই কারুকাজগুলো আজও সাক্ষ্য দেয় তাঁর সৃজনশীলতার।
এই সংগ্রহশালা কোনো প্রদর্শনীর জন্য নয়, এটি একটি পরিবারের আবেগের অংশ। প্রতিটি সেলাই আর প্রতিটি নকশা নীরবে বলে যায় একজন মায়ের মমতা ও সৃজনশীলতার গল্প।