১১ জুন শুরু ফুটবল বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮ দল। ‘বিশ্বকাপের দল' শীর্ষক এই ধারাবাহিকে কোন দল কেমন, সেটি তুলে ধরার প্রয়াস। আজকের পর্বে সেনেগাল
লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপ মহাদেশের বাইরে কোনো দলই বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের প্রকৃত দাবিদার হিসেবে তুলে ধরতে পারেনি। তবে চার বছর আগে কাতারে মরক্কোর সেমিফাইনাল-যাত্রা সেই মিথ ভেঙে দিয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই সাফল্যকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন বুনছে সেনেগাল।
সেনেগালের এবারের বিশ্বকাপ-যাত্রা শুরু হচ্ছে এক চরম অনিশ্চয়তা ও নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে। গত জানুয়ারিতে স্বাগতিক মরক্কোর বিপক্ষে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস (আফকন) ফাইনালের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলো আজও ফুটবলভক্তদের মনে তাজা। গোলশূন্য ম্যাচের যোগ করা সময়ে মরক্কোর পক্ষে একটি বিতর্কিত পেনাল্টি দেওয়ার প্রতিবাদে পাপে থিয়াউয়ের শিষ্যরা মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। ১৭ মিনিট পর ফিরে এলেও নাটকীয়তার শেষ সেখানেই হয়নি। ব্রাহিম দিয়াজের নেওয়া সেই পানেনকা শটটি সেনেগালের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মঁদি দাঁড়িয়ে থেকে রুখে দেন। এরপর অতিরিক্ত সময়ে পাপে গেয়ের গোলে মাঠের লড়াইয়ে জয়ী হয় সেনেগাল।
তবে সেই উল্লাস দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার শাস্তিস্বরূপ আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ) সেনেগালের সেই জয় বাতিল করে মরক্কোকে ৩-০ ব্যবধানে জয়ী ঘোষণা করে। বিষয়টি বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে (সিএএস) আপিল অবস্থায় রয়েছে। এই আইনি লড়াইয়ের মধ্যেই প্যারিসে এক প্রীতি ম্যাচে ট্রফি হাতে নিয়ে ভক্তদের অভিবাদন জানিয়েছেন সাদিও মানেরা, যা স্পষ্ট বার্তা দেয়—টেবিলে যা-ই ঘটুক, মাঠের বিচারে তারাই মহাদেশসেরা।
পাপে থিয়াউয়ের অধীনে সেনেগাল এখন আফ্রিকার সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল। সাদিও মানে, কালিদু কুলিবালি, ইদ্রিসা গেয়ে এবং চেলসি থেকে বায়ার্ন মিউনিখে ধারে যাওয়া নিকোলাস জ্যাকসনের মতো তারকাদের পাশাপাশি পিএসজির ইব্রাহিম এমবায়েদের নিয়ে গড়া এই দলকে বিশেষজ্ঞরা এবার বিশ্বকাপের ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে গত জুনে ইংল্যান্ডকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়া প্রীতি ম্যাচটি প্রমাণ করে দিয়েছে, সেনেগাল এখন যেকোনো শক্তিকে কোণঠাসা করার সামর্থ্য রাখে।
বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘আই’তে সেনেগালের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স, নরওয়ে ও ইরাক। উদ্বোধনী ম্যাচেই তারা মুখোমুখি হবে বর্তমান রানার্সআপ ফ্রান্সের। ২৪ বছর আগে ২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেও ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছিল সেনেগাল। পাপে থিয়াউ নিজে সেই সোনালি প্রজন্মের সদস্য ছিলেন, ফলে সেই জয়ের মনস্তত্ত্ব তিনি বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে গেঁথে দিতে চাইছেন।
তবে খেলোয়াড়দের জন্য মাঠের প্রস্তুতি সহজ হলেও দর্শকদের জন্য পথটা কঠিন। মার্কিন সরকারের ভ্রমণনীতি অনুযায়ী, সেনেগালের সমর্থকদের জন্য প্রায় ১৫ হাজার ডলারের জামানত বা বন্ড প্রদানের নিয়ম রয়েছে। এই অর্থ সমর্থকদের মাঠে আসার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যালারিতে যদি সেনেগালের সমর্থকদের সেই ঐতিহ্যবাহী ড্রাম আর নাচের উৎসব না থাকে, তবে খেলোয়াড়দের জন্য লড়াইটা কিছুটা ম্যাড়ম্যাড়ে হতে পারে।
পাপে গেয়ে সরাসরি বলেছেন, তাঁরা কেবল কোয়ার্টার ফাইনাল নয়, এবার বিশ্বকাপ জিততেই উত্তর আমেরিকায় পা রাখবেন। গোটা আফ্রিকার ফুটবলের আত্মবিশ্বাস ও জয়ের নতুন নাম এখন তেরাঙ্গার সিংহরা।
২০০২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট পাপে থিয়াউয়ের চেয়ে সেনেগালের সেই সোনালি ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার যোগ্য আর কেউ নেই! সেবার সুইডেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে হেনরি কামারার জয়সূচক গোলটির পেছনের কারিগর ছিলেন এই সাবেক সেন্টার-ফরোয়ার্ড। ২০০৯ সালে অবসর নেওয়া ডাকারের এই সন্তান পরবর্তী সময়ে সাবেক সতীর্থ আলিও সিসের সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্থায়ীভাবে প্রধান কোচের দায়িত্ব পান। অত্যন্ত সাবলীলভাবে দলের হাল ধরে তিনি গত বছর জুনে প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারানোর মতো বড় সাফল্য এনে দেন এবং সেনেগালের বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেন।
ইউরোপীয় ফুটবল ছেড়ে চলে গেলেও সেনেগাল জাতীয় দলে সাদিও মানের প্রভাব বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং আল নাসরের এই তারকা মাঠের নেতা হিসেবে নিজের দক্ষতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। বাছাইপর্বে ৫টি গোল করে লায়ন্স অব তেরাঙ্গাদের চতুর্থবারের মতো এবং টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড তাঁর ক্লাবের হয়েও দুর্দান্ত ফর্ম ধরে রেখেছেন; চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে আল নাসরের হয়ে ২২ গোলে (গোল ও অ্যাসিস্ট) অবদান রেখেছেন তিনি।
র্যাঙ্কিং: ১৪
অংশগ্রহণ: ৪
সেরা সাফল্য: শেষ আট (২০০২)
অঞ্চল: আফ্রিকা
ডাকনাম: লায়নস অব তেরাঙ্গা
বিশ্বকাপে ১২ ম্যাচ, ৫ জয়, ৩ ড্র, ৪ হার
১৬ জুন ফ্রান্স নিউ জার্সি রাত ১টা
২৩ জুন নরওয়ে নিউ জার্সি সকাল ৬টা
২৬ জুন ইরাক টরন্টো রাত ১টা