হোম > খেলা > ফুটবল

আর্তেতার আর্সেনাল: ধ্বংসস্তূপ থেকে শিরোপার সিংহাসনে

ক্রীড়া ডেস্ক    

এই স্প্যানিশ কোচের হাত ধরে বদলে গেছে লন্ডনের ক্লাবটি। ছবি: সংগৃহীত

এক সময় এমিরেটস স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে নেমে আসত অদ্ভুত এক নীরবতা। ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই খালি হতে শুরু করত আসন। ক্লাবের ঐতিহ্য, ইতিহাস, গৌরব—সব যেন ধীরে ধীরে মলিন হয়ে যাচ্ছিল। ২০০৪ সালের পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা যেন আর্সেনালের জন্য এক দূর স্বপ্ন। সেই ক্লাবকেই কয়েক বছরের ব্যবধানে নতুন প্রাণ, নতুন দর্শন আর নতুন পরিচয়ে ফিরিয়ে আনলেন এক সাবেক অধিনায়ক—মিকেল আর্তেতা।

২২ বছরের অপেক্ষা শেষে আর্তেতার কোচিংয়ে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছে আর্সেনাল। গানারদের পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনতে শুধু একজন কোচ হিসেবে নয়, বরং সংস্কারক, স্থপতি ও মানসিকতার রূপকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সাবেক এই ফুটবলার। আর্সেনালের সাম্প্রতিক শিরোপাজয় কেবল একটি শিরোপার গল্প নয়; এটি একটি ক্লাবের ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাসকে নতুন করে দাঁড় করানোর কাহিনি।

পতনের গভীরতা থেকে শুরু

আর্তেতার পুনর্গঠনের গল্প শুরু হয় এক তীব্র উপলব্ধি দিয়ে। আর্সেনালের দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি ছিলেন প্রতিপক্ষ ডাগআউটে—ম্যানচেস্টার সিটির সহকারী কোচ হিসেবে। এমিরেটসে বসে তিনি দেখেছিলেন, কীভাবে প্রথমার্ধেই তিন গোলে পিছিয়ে পড়ে আর্সেনাল। ম্যাচ শেষে গ্যালারির হাজারো আসন খালি, চারপাশে হতাশা আর নিস্তব্ধতা।

ক্লাবটির সাবেক অধিনায়ক হিসেবে দৃশ্যটি তাকে নাড়া দিয়েছিল। আর্সেন ওয়েঙ্গারের শেষ সময়ের টালমাটাল দিন তিনি দেখেছেন, কিন্তু এটিকে মনে হয়েছিল আরও গভীর সংকট। দায়িত্ব হাতে নিয়েই তাই তার প্রথম লক্ষ্য ছিল—ক্লাব ও সমর্থকদের সম্পর্ক পুনর্গঠন। সেই পুনর্গঠনের প্রতিফলন পরে দেখা যায় এমিরেটসের বাইরে। দলীয় বাসকে স্বাগত জানাতে সারিবদ্ধ সমর্থক, চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ফেরার আবেগ আর প্রিমিয়ার লিগের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ভাঙার উন্মাদনা—সবকিছু যেন এক নতুন যুগের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ছোট ছোট সিদ্ধান্তের বড় প্রভাব

আর্তেতার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার খুঁটিনাটির প্রতি মনোযোগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ফুটবল শুধু কৌশল বা ফরমেশনের খেলা নয়—এটি আবেগ, পরিবেশ এবং মানসিক শক্তিরও খেলা। সেই ভাবনা থেকেই এমিরেটসের টানেলের ঢাকনা সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। উদ্দেশ্য ছিল, কিক-অফের আগেই গ্যালারির গর্জন যেন খেলোয়াড়দের শরীরে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিপক্ষের মনে তৈরি করে চাপ।

আবার ‘নর্থ লন্ডন ফরএভার’কে ম্যাচডে সংগীতে রূপ দেওয়া ছিল পরিচয়ের পুনর্গঠন। গানটি ধীরে ধীরে শুধু সংগীত নয়, আর্সেনালের পুনর্জাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠে। লন্ডন কনির প্রশিক্ষণকেন্দ্রেও ছড়িয়ে পড়ে এই দর্শন। দেয়ালে অনুপ্রেরণামূলক বার্তা, ‘টুগেদার উই মেক হিসটোরি’–এর পাশে প্রিমিয়ার লিগ ট্রফির অন্ধকার অবয়ব—যেটি শিরোপা জয়ের আগে কখনো আলোকিত হয়নি। নতুন খেলোয়াড়দের দেখানো হতো সেই প্রতীক। যেন বলা হতো—লক্ষ্য পরিষ্কার, পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।

প্রেরণার শিল্পী আর্তেতা

কঠোর কৌশলবিদ হওয়ার পাশাপাশি আর্তেতা এক অনন্য প্রেরণাদাতা। ২০২৩ সালে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আনা চকোলেট ল্যাব্রাডর “উইন” ছিল সেই দর্শনেরই অংশ। নামের মধ্যেই ছিল বার্তা—জয়। খেলোয়াড়দের সঙ্গে কুকুরটির আবেগী সম্পর্ক দলীয় সংযোগকে আরও মানবিক করে তোলে। একই সময়ে লাগানো হয় ১৫০ বছরের পুরোনো জলপাই গাছ। আর্তেতার ব্যাখ্যায়, শিকড়কে প্রতিদিন যত্নে রাখতে হয়—নইলে তা নষ্ট হয়ে যায়। ফুটবল দলও তেমনই; সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের যত্ন না নিলে ভেঙে পড়ে। অনুশীলনেও ছিল অভিনবত্ব। কখনো বড় পর্দায় ভিডিও চালিয়ে মনোযোগের অনুশীলন, কখনো আঙুলে কলম ব্যালান্স করে বল নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুতেই লক্ষ্য ছিল মনোসংযোগ ও মানসিক দৃঢ়তা তৈরি। অ্যামাজনের ‘অল অর নাথিং’ ডকুমেন্টারিতে দেখা যায়, উত্তর লন্ডন ডার্বির আগে তিনি খেলোয়াড়দের সামনে একটি হৃদয় ও মস্তিষ্কের ছবি এঁকে বলেন—‘প্যাশন’ আর ‘ক্ল্যারিটি’ একসঙ্গে কাজ না করলে সাফল্য আসে না।

সেই ম্যাচেই দ্রুত ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্সেনাল। কখনো ক্লাব ফটোগ্রাফারকে এনে আবেগঘন বক্তৃতা, কখনো নিজের শৈশবের হার্ট সার্জারির গল্প—খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে ছুঁয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি। এমনকি লিভারপুল সফরের আগে প্রশিক্ষণ মাঠে ‘ইউল নেভার ওয়াক অ্যালোন’ বাজিয়ে অ্যানফিল্ডের আবহের জন্য দলকে প্রস্তুত করেছিলেন।

কঠোর সিদ্ধান্তের সাহস

যে কোনো বড় পুনর্গঠনের মতোই আর্তেতার পথও ছিল নির্মম সিদ্ধান্তে ভরা। তার প্রথম ম্যাচের একাদশ থেকে এখন টিকে আছেন কেবল বুকায়ো সাকা—যিনি একাডেমি থেকে উঠে আসা ক্লাবের ভবিষ্যৎ প্রতীক। পিয়েরে-এমেরিক অবামেয়াং, মেসুত ওজিল, ডেভিড লুইজদের মতো অভিজ্ঞদের ধীরে ধীরে সরিয়ে জায়গা করে দেওয়া হয় তরুণদের।

সাকার পাশে উঠে আসেন এমিল স্মিথ রো। পরে যুক্ত হন ইথান নওয়ানেরি, মাইলস লুইস-স্কেলি, আর সর্বশেষ ম্যাক্স ডাওম্যান। তেমনি গোলরক্ষক অ্যারন রামসডেল দুর্দান্ত পারফর্ম করলেও আর্তেতা ডেভিড রায়াকে নিয়ে আসেন। সমালোচনার ঝড় উপেক্ষা করে রায়াকে এক নম্বর বানানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়। কারণ, আর্তেতার কাছে ব্যক্তিগত প্রতিভার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল দলীয় সমন্বয়—যাকে তিনি বলেন ‘দ্য উই’।

বিশ্বমানের কাঠামো

আর্তেতা শুধু দল নয়, গড়েছেন একটি পরিবেশ। সহকারী গ্যাব্রিয়েল হাইনৎসে, সেট-পিস বিশেষজ্ঞ নিকোলা জোভার, গোলকিপিং কোচ ইনাকি কানা কিংবা আলবার্ট স্টুইভেনবার্গ—প্রত্যেকে যেন তার দর্শনের অংশ। রক্ষণভাগের সংগঠন, সেট-পিসে দক্ষতা, গোলরক্ষকদের ধারাবাহিক উন্নতি—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে আধুনিক, পরিপূর্ণ এক ফুটবল কাঠামো।

অভিষেকের আগেই বিশ্বকাপ দলে এই তরুণ

ভাঙা আঙুল নিয়েই ইউরোপ জয়, ভিলার নায়ক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ

ইবোলা আতঙ্কের মাঝেই বিশ্বকাপ যাত্রা, স্বস্তির খবর পেল ডিআর কঙ্গো

নতুন বাস্তবতায় বেলজিয়াম

বিশ্বকাপ জয়ের প্রাইজমানি নিজে না রেখে কর্মীদের দিয়েছেন মেসি

দোরিয়েলতনের হ্যাটট্রিকে ফেডারেশন কাপ জিতে কিংসের ট্রেবল

নিজেদের ফিরে পাওয়ার লড়াই জার্মানির

রাজমিস্ত্রির সহকারী থেকে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে

গার্দিওলার ভাগ্যে কী রয়েছে

‘শিরোপাটা আর্সেনালেরই প্রাপ্য’