‘জাস্ট ওয়াও’-এমন রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ কি আগে কখনো দেখেছেন? আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম ১ লাখ ৩২ হাজার ধারণক্ষমতার হলেও দক্ষিণ আফ্রিকা-আফগানিস্তান ম্যাচটা ছিল উত্তেজনায় ঠাসা। ম্যাচটা কতটা রোমাঞ্চকর, সেটা ম্যাচের শেষ অংশে ধারাভাষ্য শুনলেও বুঝতে পারবেন। ডাবল সুপার ওভারে গড়ানো ম্যাচে সমানে সমানে লড়াই করেছিল আফগানিস্তান-দক্ষিণ আফ্রিকা। শেষ হাসি হেসেছে প্রোটিয়ারা। আফগানদেরও আর গড়া হলো না ইতিহাস।
চেন্নাইয়ের এমএ চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে রোববার নিউজিল্যান্ডের কাছে ৭ উইকেটে হেরে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু করেছিল আফগানিস্তান। আজ মোদি স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকা-আফগানিস্তান মূল ম্যাচ টাই হলে গড়ায় সুপার ওভারে। প্রথম দফায় সুপার ওভারে গড়ানোর পর আফগানিস্তান ১৭ রান নিলে অনেকেই তখন আফগানদের জয় দেখতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকাও যে হার মানার পাত্র নয়। প্রোটিয়ারা ১৭ রান নিলে ফের ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে।
দ্বিতীয় সুপারে আগে ব্যাটিং পেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা তুলেছে ২৩ রান। ২৪ রানের লক্ষ্যে নেমে প্রথম বল মোহাম্মদ নবি ছক্কা মারতে গিয়েও পারেননি। ঠিক তার পরের বলে কেশব মহারাজকে তুলে মারতে যান নবি। এজ হওয়া বল ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ধরেন ডেভিড মিলার। রহমানউল্লাহ গুরবাজ যখন ব্যাটিংয়ে নামেন, তখন আফগানদের সামনে তখন ৪ বলে ২৪ রানের সমীকরণ তৈরি হয়। ওভারের তৃতীয় থেকে পঞ্চম বলে তিনটি ছক্কা মারেন গুরবাজ। তাঁর এই হ্যাটট্রিক ছক্কার সঙ্গে সঙ্গে ধারাভাষ্যকক্ষেও দেখা যায় উত্তেজনা। চাপের মুহূর্তে শেষ বলটা ওয়াইড করে বসেন মহারাজ। পরের বলে তুলে মারতে গিয়ে পয়েন্টে মিলারের তালুবন্দী হয়েছেন গুরবাজ। দক্ষিণ আফ্রিকা দল যখন আনন্দ উল্লাসে ব্যস্ত, তখন গুরবাজের মাথায় হাত।
দ্বিতীয় সুপার ওভারে ৪ রানে জিতে প্রোটিয়ারা সুপার এইট একরকম নিশ্চিত করে ফেলেছে। ২ ম্যাচে তাদের পয়েন্ট ৪। নিউজিল্যান্ডেরও পয়েন্ট ৪। তবে নেট রানরেটের কারণে অবস্থান ভিন্ন। +১.৯১৯ নেট রানরেট নিয়ে সবার ওপরে নিউজিল্যান্ড। দুইয়ে থাকা প্রোটিয়াদের নেট রানরেট +১.৪২৫। আফগানিস্তান দুই ম্যাচ খেলে কোনোটিতেই জিততে পারেনি। এই গ্রুপের অপর দুই দল কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও কোনো পয়েন্ট পায়নি।
ম্যাচের পুরো রোমাঞ্চ যেন জমে ছিল শেষের জন্যই। ১৮৮ রানের লক্ষ্যে নামা আফগানিস্তানের শেষ ওভারে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৩ রান। হাতে তখন ১ উইকেট। শেষ ওভারের প্রথম বলটা কাগিসো রাবাদা করলেন নো বল। পরের বলটা দিলেন ওয়াইড। ওভারের প্রথম বৈধ ডেলিভারি তুলে মারতে যান নুর আহমাদ। সেই বল লং অফে মার্কো ইয়ানসেন ড্রপ করলেও কোনো রান নেননি নুর। পরের বলে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগ দিয়ে ছক্কা মারেন নুর। পরের বলে আবার ডট দেন তিনি।
শেষ তিন বলে যখন আফগানদের ৫ রান দরকার, তখন ফের নো বল দেন রাবাদা। সেই নো বল থেকে আরও দুই রান নেন নুর। তাতে ৩ বলে ২ রানের সমীকরণের সামনে এসে পড়ে আফগানরা। ফ্রি হিটের বল লং অফে ঠেলে এক রান নিয়েছেন নুর। তবে নন স্ট্রাইকে দাঁড়িয়ে থাকা ফজলহক ফারুকি দাগের একটু বাইরে থাকায় বেল ফেলে দেন রাবাদা। তাতে ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে। তাও একটা সুপার নয়, ডাবল সুপার ওভার। ১৯ বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসে এবারই প্রথম ম্যাচ গড়াল ডাবল সুপার ওভারে। আর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে এই নিয়ে দুইবার দেখা গেল জোড়া সুপার ওভারের ম্যাচ। এর আগে ২০২৪ সালে বেঙ্গালুরুতে ভারতের বিপক্ষে জোড়া সুপার ওভারের ম্যাচে হেরেছিল আফগানরা।
নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে আজ টস জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আফগানিস্তানের অধিনায়ক রশিদ খান। তৃতীয় ওভারের তৃতীয় বলে এইডেন মার্করামকে (৫) ফেরান ফজলহক ফারুকি। দ্বিতীয় উইকেটে ৬১ বলে ১১৪ রানের জুটি গড়েন কুইন্টন ডি কক ও রায়ান রিকেলটন। ১৩তম ওভারে ডি কক ও রিকেলটনকে ফিরিয়ে জোড়া ধাক্কা দেন রশিদ খান। তাতে ১৩ ওভারে ৩ উইকেটে ১২৭ রানে পরিণত হয় প্রোটিয়ারা। একটা পর্যায়ে ২০০ রান হওয়ার তুমুল সম্ভাবনা থাকলেও সেটা সম্ভব হয়নি। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৬ উইকেটে ১৮৭ রান করেছে প্রোটিয়ারা।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস সর্বোচ্চ ৬১ রান করেন রিকেলটন। ২৮ বলের ইনিংসে ৫ চার ও ৪ ছক্কা মারেন তিনি। আফগানিস্তানের আজমতউল্লাহ ওমরজাই ৪ ওভারে ৪১ রানে নিয়েছেন ৩ উইকেট। রশিদ খান ও ফজলহক ফারুকি নিয়েছেন ২ ও ১ উইকেট। ১৮৮ রানের লক্ষ্যে নেমে প্রথম ৪.১ ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৫১ রান তোলে আফগানরা। মুহূর্তেই আফগানরা ৫.২ ওভারে ৩ উইকেটে ৫২ রানে পরিণত হয়। ওপেনিংয়ে নামা গুরবাজ ৪২ বলে ৪ চার ও ৭ ছক্কায় করেন ৮৪ রান। চতুর্থ উইকেটে দারউইশ রাসুলির সঙ্গে ৪৩ বলে ৬৯ রানের জুটি গড়তে অবদান রাখেন গুরবাজ।
মূল ম্যাচের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার দুর্দান্ত ফিল্ডিংও ম্যাচে দারুণ অবদান রেখেছে। ১৯তম ওভারের তৃতীয় বলে মার্কো ইয়ানসেনকে তুলে মারতে যান রশিদ খান। লং অন থেকে দৌড়ে এসে স্লাইড করে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেন মিলার। ১৯.৪ ওভারে ১৮৭ রানে আফগানরা গুটিয়ে গেলে ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে। ডাবল সুপার ওভারে গড়ানো ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন লুঙ্গি এনগিদি। মূল ম্যাচে ৪ ওভারে ২৬ রানে ৩ উইকেট নিয়েছেন তিনি।