২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর শতাধিক মানুষকে আসামি করে মামলা করার যে ট্র্যাডিশন চালু হয়েছিল, তারই পরশ যেন পড়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার মুশরীভূজা বটতলা গ্রামে।
সেখানে গ্রামবাসী দুই পক্ষ হয়ে গেছে এবং এক পক্ষ আরেক পক্ষের লোকদের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কিছু মানুষকে আসামি করে মামলা ঠুকে দিয়েছে। দুই পক্ষই যখন মামলা করে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রকাশ করে চলেছে, তখন গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে দুই পক্ষের অধিকাংশ পুরুষ গ্রামছাড়া হয়েছেন। অনেক পরিবারই নাকি নারী ও শিশুদের ওপর নির্ভর করে চলছে।
গ্রাম যে এখন ‘ভিলেজ পলিটিকস’-এর দুর্দান্ত নিদর্শন হয়ে উঠছে, তার একটি প্রমাণ এই মুশরীভূজা বটতলা গ্রাম। দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন মানুষ নিহত হয়েছেন। দুই পক্ষের দুজন নারী মামলাগুলো করার পর এখন গ্রাম আর গ্রাম নেই। কোনো সমঝোতায় না এসে মামলা করে আদতে কি কোনো লাভ হলো? গণ-অভ্যুত্থানের পর মামলা-বাণিজ্য করে অনেকেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন বলে শোনা যায়। কিন্তু গ্রামের দুই পক্ষের নামে মামলা করে কি সেই ফায়দা লোটা সম্ভব? আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, এ রকম নিরীহ মানুষকেও মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুই পক্ষের বিবাদের কারণে করা মামলা মানেই হয়রানি। এসব মামলায় দুই পক্ষের আইনজীবীদের পকেট স্ফীত হতে পারে বটে, কিন্তু তাতে আদতে তা বিচার পর্যন্ত যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়।
পূর্ববিরোধের জের ধরে যে হামলা-মামলা হয়, তাতে কার কোন উপকার হয়? রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি জমিসংক্রান্ত বিরোধের কারণেও অনেক মামলা হয়। একধরনের মামলাবাজ মানুষও গ্রামে বেশ মূল্য পেতে থাকে, তাদের কাজই হয় মিথ্যা মামলা দিয়ে মানুষকে হেনস্তা করা। এই ধরনের অপকর্ম আদতে গ্রামের পরিবেশ নষ্ট করে। কিন্তু তারপরও পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেয়ে অন্যকে শায়েস্তা করার প্রবণতা বাড়তে থাকলে তা দুঃখজনক পরিণতি বয়ে আনে।
হয়রানিমূলক মামলার ক্ষেত্রে কিছুকরণীয় আছে। অনেক ব্যক্তিকে যখন এক মামলায় আসামি করা হয়, তখন খুব সতর্কভাবে সে বিচারকাজ করতে হয়। কারণ, ভুল বিচার হলে অনেক নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তির সম্মুখীন হতে পারেন। মামলার প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করা বাঞ্ছনীয়। পুলিশ এসব ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত না করলে তার প্রভাব বিচারালয় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তদন্তে গাফিলতি বা পক্ষপাতিত্বও মামলার রায়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও একটি বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিলে হয়রানিমূলক মামলা কমে যেতে পারে। সেটা হলো, যদি কেউ কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে জরিমানা ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। মিথ্যা মামলা করার কারণে শাস্তি পেলে ভবিষ্যতে মামলাবাজেরাও ভেবেচিন্তে মামলা করবে।
মুশরীভূজা বটতলা গ্রামের পুরুষেরা নিজ গ্রামে ফিরে আসুক। মামলা-সংস্কৃতি থেকে গ্রামটি বাঁচুক, এই কামনা আমাদের।