‘মবের মুলুক’ কাকে বলে, ইউনূসীয় শাসনামলে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে দেশের মানুষ। এই কথাটি পত্রপত্রিকায়, চায়ের আড্ডায়, আলোচনা সভায় এত বেশি শোনা গেছে যে মূল যে ‘মগের মুলুক’ প্রবাদটি, তা যেন অনেকটা তলিয়ে গেছে, সেভাবে আর ব্যবহার হচ্ছে না।
মগের মুলুককে ফিরিয়ে আনার জন্যই হয়তোবা ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেসের চালক একখানা কীর্তি গড়েছেন। এখানে দুই মিনিট যাত্রাবিরতির কথা ছিল, কিন্তু চালকের কী মনে হয়েছিল কে জানে, তিনি দুই মিনিটকে আমলেই নেননি। ট্রেন রেখে চলে গেছেন ঘুরতে এবং ফিরেছেন ১ ঘণ্টা ৭ মিনিট পর!
মগের মুলুক মানে কী, তা এই চ্যাটজিপিটির যুগে চাইলেই যে কেউ অনায়াসে জেনে নিতে পারেন। তবু ‘মগ’ শব্দটি কোথা থেকে এল, কেনইবা মগের মুলুক প্রবাদটি চালু হয়ে গেল, তা নিয়ে কিঞ্চিৎ আলাপ করা যায়।
বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে যে জনগোষ্ঠী বসবাস করত, তারাই ছিল ‘মগ’ নামে পরিচিত। সেই ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীতে যখন ঐশ্বর্যবান হওয়ার লোভে বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন মানুষ মূলত জলযানে করে ভারতবর্ষে আসতে লাগল, তখন সেই কাফেলায় যুক্ত হয়েছিল মগেরাও। পর্তুগিজ জলদস্যুদের সঙ্গে মগ জলদস্যুরাও তখন বাংলার দক্ষিণ উপকূলে হামলা চালিয়েছে। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, সুন্দরবন এলাকা এদের হামলায় জর্জরিত হয়েছে। গ্রাম লুট করা, মানুষ অপহরণ করে দাসে পরিণত করা ছিল তাদের কাজ। এরা যেখানেই এসেছে, সেখানেই নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। ফলে যেখানে নিয়মকানুন নেই, কিংবা যেখানে যে কেউ যা খুশি করতে পারে, সে রকম জায়গাকে মগের মুলুক বলা হয়ে থাকে। আমাদের বিজ্ঞ এই ট্রেনচালকও মনে হয় মনে মনে মগের মুলুকের বাসিন্দা হয়ে গেছেন। তাঁর ইচ্ছে হয়েছে, তিনি ট্রেন ছেড়ে ১ ঘণ্টা ৭ মিনিটের জন্য চলে গেছেন হাওয়া খেতে!
আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে দেখছি লেখা আছে, ‘এ বিষয়ে কথা বলতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মো. হাবিবুর রহমানের মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি তা ধরেননি। পরে প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী (চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার) আব্দুল মতিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় শুনে কল কেটে দেন। এরপর তিনি আর কল ধরেননি।’ ঘটনা পরিষ্কার, কোথায় তাঁরা বলবেন, এই চালকের ব্যাপারে তাঁরা কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন, তা না বলে তাঁরা বরং সাংবাদিকদের প্রশ্নের কাছ থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখছেন! তাহলে শুধু চালককে দোষ দিলেই কি হবে? মগের মুলুকের বাসিন্দা কি এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও নন?
জনসেবামূলক চাকরিতে ঢুকলে নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলা আবশ্যক। জনগণের সেবক মানে কী, তা নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেবক যখন মগের মুলুকের বাসিন্দা হন, তখন তাকে জবাবদিহির আওতায় না আনলে দেশটাই যে মগের মুলুকের পথে হাঁটা দেবে, সেটা কি আমরা বুঝতে পারছি?