ইতিমধ্যে দেশের পাঁচটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলসমূহ। এরই মধ্যে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, ছাত্র সংসদ নির্বাচন কি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে? যদি পারে, তবে সেই প্রভাব কতটুকু বাস্তব ও কার্যকর?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অসংখ্য জাতীয় নেতার উত্থান ঘটেছে ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র সংসদের হাত ধরে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন তরুণদের জন্য গণতন্ত্রের প্রথম বাস্তব পাঠশালা। এখানেই তাঁরা শেখেন বক্তব্য দেওয়া, সংগঠন গড়ে তোলা, জনসংযোগ, ভোট ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের কৌশল। এই অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে দক্ষ সংগঠক ও নেতৃত্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সরাসরি নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় রাজনীতির মান ও নেতৃত্ব কাঠামোকে প্রভাবিত করে।
ছাত্র সংসদকে অনেকেই গণতন্ত্রের ‘মানুষ তৈরির কারখানা’ বলে থাকেন। যেসব ক্যাম্পাসে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়, সেখানে ভোট দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে এবং ভিন্নমতের সহাবস্থান শেখার সুযোগ তৈরি হয়। নির্বাচনকে সহিংসতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখার মানসিকতা সেখান থেকেই জন্ম নেয়। এসব শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচনে ভোটার হিসেবে তুলনামূলকভাবে বেশি সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন।
একই সঙ্গে ছাত্র সংসদ নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি হিসেবেও কাজ করে। দলীয় প্রভাব, সরকারবিরোধী ধারা এবং জনপ্রিয়তার যে প্রতিফলন সেখানে দেখা যায়, তা অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির জনমতের একটি আগাম ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের মোট ভোটারের একটি বড় অংশ তরুণ। এই তরুণেরা শুধু ভোটার নন; তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ক্যাম্পাসভিত্তিক আলোচনা ও রাজনৈতিক প্রচারে মতপ্রভাবক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে তাঁদের রাজনৈতিক মনোভাব জাতীয় নির্বাচনের গতিপথে প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ থেকে ৪৫ শতাংশই তরুণ। অর্থাৎ ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী। সংখ্যাগতভাবে এটি সাড়ে ৫ কোটির বেশি ভোটারের বিশাল এক জনগোষ্ঠী। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি এই ভোটারদের সামান্য ঝোঁকও নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে। তাই তরুণদের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক মনোভাব উপেক্ষা করে কোনো দলের পক্ষেই জাতীয় নির্বাচনে টেকসই সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।
তবে বাস্তবতা হলো, বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা মোট ভোটারের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৫০ থেকে ৫৫ লাখ, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে এই অংশটি এককভাবে জাতীয় নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করতে সক্ষম নয়।
কিন্তু প্রভাবের দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ তাঁরাই সমাজের সবচেয়ে সংগঠিত, সচেতন ও মতামত গঠনকারী অংশ। ক্যাম্পাসে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক চিন্তা ও আন্দোলন দ্রুত সমাজের অন্যান্য স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় সমাজে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে সংখ্যায় কম হলেও তাঁদের রাজনৈতিক ভূমিকা জাতীয় নির্বাচনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে ছাত্র সংসদে ছাত্রশিবিরের সাম্প্রতিক জয় নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত। তবে এটিকে সরাসরি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা যেখানে প্রায় ১ লাখ, সেখানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটির বেশি। এই বিশাল ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয়—ছাত্ররাজনীতির শক্তি দিয়ে এককভাবে জাতীয় নির্বাচন জয় করা বাস্তবসম্মত নয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্ভর করে দলীয় নিবন্ধন ও আইনি বৈধতা, প্রার্থী দেওয়ার সক্ষমতা, মাঠপর্যায়ের সংগঠন, জোট রাজনীতি, ভোটারদের সামগ্রিক মনোভাব এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বাস্তবতার ওপর। এসব বিষয় উপেক্ষা করে কেবল ক্যাম্পাস রাজনীতির সাফল্যের ওপর ভর করে জাতীয় রাজনীতিতে বিজয় অর্জন কার্যত অসম্ভব।
তবে এটাও সত্য, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রভাব একেবারেই শূন্য নয়। শিবির সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রমাণ করেছে যে তারা এখনো একটি সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আদর্শভিত্তিক শক্তি। এতে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে আস্থা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দেশের স্বনামধন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই জয় সাধারণ জনগণের মাঝেও একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতার ওপর যাঁরা আস্থা রাখেন, তাঁদের একটি অংশ পরোক্ষভাবে জামায়াত-শিবিরের প্রতিও নতুন করে ভাবতে শুরু করতে পারেন।
তবে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা এতটা সরল নয়। দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা ধর্মীয় অবস্থানের কারণে জামায়াতের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারে। পাশাপাশি নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও কম নয়। যদি বিএনপি তাদের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ও জীবনসংগ্রামের প্রশ্নে কার্যকরভাবে আস্থা অর্জন করতে পারে, তবে সেখানে জামায়াতের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া দেশে একটি বড় অংশের ‘লিকুইড ভোটার’ রয়েছে, যাঁরা কোনো নির্দিষ্ট দলীয় আদর্শে আবদ্ধ নন। পরিস্থিতি, নেতৃত্ব ও সময়ের বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্ত বদলায়। জুলাই বিপ্লবের পর জনগণের মধ্যে গৎবাঁধা রাজনীতির বাইরে নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে, যা পুরোনো রাজনৈতিক মুখগুলোর প্রতি একধরনের সংশয় সৃষ্টি করেছে।
বিএনপি বর্তমানে সরকারবিরোধী আবেগ ও গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত সমর্থনের কারণে একটি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ফলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা নিঃসন্দেহে একটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। একই সঙ্গে জাতীয় পার্টির সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জনগণ যেহেতু তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব খুঁজছে, সে ক্ষেত্রে তারা অনেক ভোটারের কাছে একটি বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, জনগণের প্রধান প্রত্যাশা একটাই—ভোটের অধিকার ও বাক্স্বাধীনতা। এমন একটি নির্বাচন, যেখানে ভোট নিজের ইচ্ছেমতো দেওয়া যাবে এবং যার ফলাফল পূর্বনির্ধারিত নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাসাভাড়া ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ কমানো, শিক্ষিত বেকারত্ব দূর করা, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগ—এসব বিষয়ই ভোটারদের সিদ্ধান্তে মুখ্য হয়ে উঠছে।
মানুষ এখন স্লোগানে নয়, কাজে বিশ্বাস করে। তাই আগামীর নেতৃত্বে যাঁদের নির্বাচিত করা হবে, তাঁদের সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও কার্যকর নেতৃত্বই হবে জনগণের কাছে সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়।
এই বাস্তবতায় বলা যায়, ছাত্র সংসদ নির্বাচন এককভাবে কখনোই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করতে পারে না। তবে এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা দেয় এবং সমাজের রাজনৈতিক মানসিকতা গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়