বহু বছর ধরে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু পাঁচ মাসের যুদ্ধে দেশটির শাসকদের এবং বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে, ইরানের হাতে এর চেয়েও আরও শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে। আর সেটি হলো, ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক শক্তি। এই দুইয়ের কারণেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করার সক্ষমতা ইরানকে প্রতিপক্ষের ওপর বিপুল চাপ ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে এই সক্ষমতা কমতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছিলেন, হরমুজ বন্ধ করা হলো ‘এমন এক তাস, যা একবারই খেলা যায়।’ এরই ধারাবাহিকতায় উপসাগরীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে বিকল্প পথে তেল রপ্তানির ব্যবস্থা জোরদার করছে। ট্রাম্পের ইরাক-সিরিয়াবিষয়ক দূত টম বারাকের ধারণা, দুই বছরের মধ্যে হরমুজ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।
তবে বাস্তবতা এত সরল নয়। দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ মতে, এখানে তিনটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, হরমুজ নিয়ে ইরানের হুমকি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত পণ্য ও দেশভেদে ভিন্ন হবে। দ্বিতীয়ত, সময়ের সঙ্গে হরমুজ ব্যবহার করে ইরানের অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সক্ষমতা কমবে, কিন্তু পুরোপুরি শেষ না-ও হতে পারে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সুবিধা কমলেও ইরানের কৌশলগত প্রভাব একই হারে কমবে না। বরং হরমুজকেন্দ্রিক আঞ্চলিক প্রভাবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে তা আরও গভীর হতে পারে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ দিয়ে যেত। এর বড় অংশই বিকল্প পথে সরানো সম্ভব। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতায় প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল পরিবহন করছে। আরব আমিরাতের হাবশান-ফুজেইরাহ পাইপলাইনও সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতিদিন ১৮ লাখ ব্যারেল পরিবহন করছে। ইরাকের একটি পুরোনো পাইপলাইন দিয়ে বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ব্যারেল তেল তুরস্কে পাঠানো হচ্ছে। ফলে হরমুজের বিকল্প পথে নেওয়া সম্ভব হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ব্যারেলে।
আগামী কয়েক বছরেও সক্ষমতা বাড়তে পারে। আরব আমিরাতের নতুন পাইপলাইন ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ আরও ১৮ লাখ ব্যারেল পরিবহনের সুযোগ করে নিতে পারে। ইরাক বিদ্যমান পাইপলাইনের সক্ষমতা এক বছরের মধ্যে ১০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতে চায়। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের তেলক্ষেত্রকে জর্ডান, সিরিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত করতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করছে। এর সক্ষমতা হতে পারে প্রতিদিন ২৫ লাখ ব্যারেল এবং তা সম্পন্ন হতে প্রায় চার বছর সময় লাগবে। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিদিন আরও প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ এড়িয়ে পাঠানো সম্ভব হতে পারে।
তারপরও প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের জন্য হরমুজ ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না। তা ছাড়া এসব পথ পুরোপুরি নিরাপদও নয়। ইরাকের প্রকল্পগুলো নিরাপত্তা ও সীমান্ত বিরোধে আটকে যেতে পারে। সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে এশিয়ায় যাওয়া তেলবাহী জাহাজগুলো বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে ইরানের মিত্র হুতিদের হামলার ঝুঁকিতে থাকবে। লোহিতসাগর সুয়েজ খাল-ভূমধ্যসাগর পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। গত ২৯ জুলাই সুয়েজের কাছে মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে তেলবাহী মার্কিন জাহাজে ড্রোন হামলা হয়েছিল।
নতুন অবকাঠামোও ইরান বা তার মিত্র গোষ্ঠীর হামলার লক্ষ্য হতে পারে। এতে বিমা ও অর্থায়নের ব্যয় বাড়বে, ফলে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলাও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
অপরিশোধিত তেলের তুলনায় পেট্রল, ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি সরানো আরও কঠিন। গত বছর হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল এই ক্যাটাগরির পণ্য রপ্তানি হয়েছে। স্থলভিত্তিক কোনো বিকল্প পাইপলাইন এখনো নেই। সৌদি আরব এমন একটি পাইপলাইন পরিকল্পনা করলেও তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। ফলে এই ক্যাটাগরির জ্বালানি রপ্তানির বড় ভরসা এখনো হরমুজ। অন্য বিকল্প হতে পারে স্থলপথ। তবে এই পরিবহন ধীর ও ব্যয়বহুল। একই সঙ্গে নিরাপত্তাঝুঁকিও বেশি।
সবচেয়ে বড় সমস্যা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিতে। কাতারের প্রায় পুরো এলএনজি রপ্তানিই হরমুজের ওপর নির্ভরশীল এবং বিকল্প কোনো এলএনজি পাইপলাইন নেই। তাত্ত্বিকভাবে কাতার-ওমান গ্যাস পাইপলাইন সম্ভব হলেও বিপুল পরিমাণ গ্যাস পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং কাতারের গ্যাস তরলীকরণ স্থাপনা নতুন করে গড়ে তোলা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
তবে বৈশ্বিক বাজারে কিছুটা স্বস্তির সুযোগ রয়েছে। কয়েক বছর জ্বালানির দাম বেশি থাকলে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে প্রতিদিন অতিরিক্ত ২০ থেকে ৩০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে আসতে পারে। চীনের শোধনাগারগুলোরও অতিরিক্ত সক্ষমতা রয়েছে এবং এলএনজি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে এই দশক শেষ হওয়ার আগেই বৈশ্বিক জ্বালানি দামের ওপর ইরানের প্রভাব কিছুটা দুর্বল হতে পারে।
কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের প্রভাব এত সহজে কমবে না। এসব দেশ শুধু রপ্তানির জন্য নয়, আমদানির ক্ষেত্রেও হরমুজের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে, তারা মোট খাদ্যশস্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে। সৌদি আরব ছাড়া অন্য দেশগুলোর হরমুজের বাইরের বন্দরগুলোতে বড় আকারের পণ্য ওঠানামার সক্ষমতা খুব সীমিত।
স্থলপথে বিপুল পরিমাণ শস্য, লৌহ আকরিক বা বক্সাইট পরিবহনও বাস্তবসম্মত নয়। একটি পানাম্যাক্স জাহাজে প্রায় ৬০ হাজার টন শস্য বহন করা যায়, যার সমপরিমাণ পণ্য নিতে প্রায় ২ হাজার ট্রাক প্রয়োজন। আঞ্চলিক রেলপথ বাড়ানো সম্ভব হলেও তা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। লোহিতসাগর থেকে কাতার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে ২৫ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি খরচ হতে পারে।
কৌশলে শস্য মজুত সাধারণত চার থেকে ছয় মাসের চাহিদা মেটাতে পারে। কিন্তু তাজা খাবার, ওষুধ ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির মতো কনটেইনারজাত পণ্যের ক্ষেত্রে এমন মজুত নেই। আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরের সক্ষমতা বছরে প্রায় ২ কোটি ২০ ফুট সমতুল্য ইউনিট বা টিএফইউ হলেও সেটি পারস্য উপসাগরের ভেতরে। হরমুজের বাইরে সবচেয়ে বড় কনটেইনার বন্দর জেদ্দার সক্ষমতা ৭৫ লাখ টিএফইউ এবং যুদ্ধের আগেই সেটি প্রায় সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চলছিল।
ইরানের পার্লামেন্টে জমা দেওয়া একটি খসড়া আইনে পণ্যের পরিমাণ, মূল্য ও জাহাজের ধরন অনুযায়ী ফি নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তবে ফি বিকল্প পরিবহন পথের খরচের চেয়ে বেশি হতে পারবে না। আরেকটি প্রস্তাব অনুযায়ী ইরানের জলসীমায় প্রতি টনে ৩ ইউরো এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় ২ ইউরো ফি নেওয়ার কথা রয়েছে। এতে সম্ভাব্য বার্ষিক আয় হতে পারে মাত্র ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার।
বিকল্প পরিবহন বাড়ার সঙ্গে এই আয় কমবে। তবে ক্রুড ট্যাংকার দ্রুত কম ফিতে চলাচলের সুযোগ পেলেও পরিশোধিত জ্বালানি, এলএনজি ও বাল্ক কার্গোর ক্ষেত্রে আরও বহু বছর তুলনামূলক বেশি ফি দিতে হতে পারে।
সবশেষে বড় দ্বন্দ্বটি হলো, ইরানের ফি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি-সমঝোতা প্রয়োজন। কিন্তু ফি দিতে অস্বীকার করা জাহাজকে বাধ্য করতে হামলার হুমকি দিলে সেই শান্তি আবার ঝুঁকিতে পড়বে। তাই বলা যায়, ইরানের লক্ষ্য হয়তো অর্থ আদায় নয়। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অংশগ্রহণ বজায় রাখা এবং হরমুজের প্রবেশদ্বারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করা। এমনকি ওমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কাঠামো, সামুদ্রিক সেবা বা জাহাজ চলাচলের অনুমতিপত্রের মতো দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থাও ইরান চাইতে পারে।
সবশেষে, বিকল্প অবকাঠামো গড়ে উঠলে হরমুজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কমবে, কিন্তু ইরানের কৌশলগত প্রভাব দ্রুতই শেষ হচ্ছে না। আর যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব দীর্ঘদিন টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।