সম্প্রতি কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে পর্যটক শৌভিক রায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু দেশের পর্যটন খাতের জন্য আরেকটি সতর্কসংকেত হয়ে এসেছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্যারাসেইলিং চলাকালে তিনি সমুদ্রে পড়ে যান এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
একটি বিনোদনমূলক ও রোমাঞ্চকর কার্যক্রম যে মুহূর্তেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে, সাম্প্রতিক এই ঘটনা আবারও তা প্রমাণ করল। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে একই এলাকায় প্যারাসেইলিংকে ঘিরে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। কখনো পর্যটক ঝাউগাছের মাথায় আটকে গেছেন, কখনো দড়ি ছিঁড়ে বা নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে আহত হয়েছেন। এমন ঘটনার পর প্রশাসন একাধিকবার প্যারাসেইলিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধও করেছে।
প্রশ্ন হলো, কেন একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে? প্রতিবার তদন্তের ঘোষণা আসে, ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আর দৃশ্যমান হয় না। ফলে দুর্ঘটনা যেমন থামে না, তেমনি পর্যটকদের আস্থাও ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।
অথচ এই খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের বহু দেশ পর্যটনকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা কম নয়। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সেন্ট মার্টিন, বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা, নদী ও গ্রামীণ সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে পর্যটনের জন্য আমাদের রয়েছে অসাধারণ সম্ভাবনা।
কিন্তু পর্যটন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো নিরাপত্তা। একজন দেশি বা বিদেশি পর্যটক যখন কোনো গন্তব্য নির্বাচন করেন, তখন তিনি শুধু সুন্দর দৃশ্য দেখতে চান না; তিনি নিশ্চিত হতে চান, সেখানে তাঁর জীবন নিরাপদ থাকবে কি না? একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, একটি গন্তব্যের প্রতি মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে একটি দেশের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে বহু বছর লাগে, কিন্তু অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে সেই সুনাম নষ্ট হতে সময় লাগে না।
বিশ্বের সফল পর্যটননির্ভর দেশগুলো এই বাস্তবতা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো পর্যটকদের নিরাপত্তাকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। বিশেষ করে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমে কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড, প্রশিক্ষিত অপারেটর, নিয়মিত সরঞ্জাম পরীক্ষা এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে পর্যটকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে এবং সেই আস্থাই তাদের পর্যটন অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করেছে।
বাংলাদেশেও পর্যটন অর্থনীতি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। কৃষি ও শিল্পের পাশাপাশি পর্যটন হতে পারে জাতীয় আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। লাখো তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিকাশ, পরিবহন ও সেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে এই খাত অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পূর্বশর্ত হলো আস্থা, আর আস্থার ভিত্তি হলো নিরাপত্তা।
বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক পর্যটন এলাকায় এখনো আন্তর্জাতিক মানের যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পর্যাপ্ত জরুরি চিকিৎসাসেবা নেই, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জামের অভাব রয়েছে, প্রশিক্ষিত জনবলও পর্যাপ্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নির্ভর করে ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর। এর সঙ্গে যদি রোমাঞ্চভিত্তিক পর্যটন কার্যক্রমে নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘিত হয়, তাহলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কক্সবাজারের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই দুর্বলতাগুলোকে আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এখন আর শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন বা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের জন্য আন্তর্জাতিক মানের নীতিমালা প্রণয়ন, বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নিরীক্ষা, প্রশিক্ষিত অপারেটর নিয়োগ, পর্যটক বিমা, আধুনিক উদ্ধারব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করার অধিকার কারও নেই।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন পর্যটন অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচনের বাস্তব সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পর্যটনের সঙ্গে যদি বারবার দুর্ঘটনা, নিরাপত্তাহীনতা ও অব্যবস্থাপনার খবর যুক্ত হয়, তাহলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আস্থা অর্জন করা কঠিন হবে। আমরা বিশ্বাস করি, পর্যটন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আমূল পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে, তাদের জন্য এসব ঘটনা শুধু হতাশাজনক নয়, গভীর উদ্বেগেরও কারণ।
কক্সবাজারের এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি আমাদের পর্যটন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। সেই বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট—নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দিলে পর্যটনের স্বপ্ন পূরণ হবে না। উন্নত সড়ক, আধুনিক অবকাঠামো, আকর্ষণীয় প্রকল্প কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারণা—সবকিছুই অর্থহীন হয়ে পড়বে, যদি একজন পর্যটক নিরাপদে বাড়ি ফিরতে না পারেন।
পর্যটনের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়, প্রশাসন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবসায়ী মহলের এখনই আত্মসমালোচনার সময়। কারণ পর্যটনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে নতুন কোনো প্রকল্প উদ্বোধনের মাধ্যমে নয়; বরং একজন পর্যটকের জীবন কতটা নিরাপদ রাখা যাচ্ছে, তার মাধ্যমে।