হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

এটা আমাদের পৃথিবী, রক্ষার দায়িত্বও আমাদের

মৃত্যুঞ্জয় রায় 

প্রকৃতি আমাদের জীবনদায়ী, আমরা প্রকৃতিকে কী দিচ্ছি। ছবি: আজকের পত্রিকা

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সকালে ঢাকার রমনা উদ্যানে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, এবার বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য কেন দেওয়া হলো ‘প্রকৃতির অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’। কথাটার সরল অর্থ করলে দাঁড়ায়—আমাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রকৃতির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের জলবায়ু ভালো রাখার জন্য কাজ করতে হবে। এই দায়িত্ববোধের কথাটা এসেছে পৃথিবীর প্রতি আমাদের নিদারুণ অবজ্ঞা, অবহেলা ও অত্যাচার থেকে। আমরা কখনো কেউ কি মনে করেছি যে এটা আমাদের পৃথিবী? আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি সেখানে বাঙালিরা যেমন আছে, তেমনি আছে চীনা, জাপানি, জার্মান, ডেনিশ, অস্ট্রেলিয়ান ও আমেরিকানরা। এ পৃথিবীর ওপর আমরা সবাই বাস করছি। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত, জাতিগত, গোষ্ঠীগত, ধর্মগত সংকীর্ণ চিন্তাধারা বহুভাগে বিভক্ত। এমনকি রাজনীতি, অর্থনীতি, ভৌগোলিক অবস্থা ইত্যাদিও আমাদের নানাভাবে দিন দিন বিভক্ত থেকে বিভক্ততর করে ফেলছে। সত্যিই যদি আমরা সবাই মিলে আমাদের সব চেতনা, চেষ্টা ও কর্মকে কল্যাণের পথে একত্রে চালিত করতে পারতাম, তাহলে হয়তো আমরাই হতাম পৃথিবীতে একটি জাতি—মানবজাতি। তখন আমাদের পরিবেশ, প্রকৃতি ও পৃথিবীর রক্ষণে আমরা এখনকার চেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারতাম। যাক, সে সুযোগ এখন আর আমাদের হাতে নেই। সে জন্য এক বিপর্যয়কর পরিণতির দিকে বোধ হয় আমরা ছুটে চলেছি, আমাদের ভবিষ্যৎ কী, সেটাও আমরা সঠিকভাবে অনুমান করতে পারছি না।

একত্রে থাকার, একজোটে কাজ করার অনুপ্রেরণা তো আমরা প্রকৃতি থেকেই পেতে পারি। আমরা মানুষেরা নিজেদের মধ্যে যতটা বৈষম্য করি, বনের পশুরাও তত বিভেদ করে না, গাছপালা তো নয়ই। কোনো বৃক্ষ বলে না যে অমুক গরিব, ওকে আমি অক্সিজেন দেব না; বাতাস বলে না আমি তাকে আমার হাওয়া দিয়ে শীতল করব, ওকে করব না। এমনকি বৃষ্টি যখন ঝরে তখন পৃথিবীর বুকে থাকা সব জীবজগৎই সে সুধারসে সিক্ত হয়, কোনো বৈষম্য নেই সেখানে। সূর্য ভোরে ওঠার পর কি কাউকে সে তার রোদ থেকে বঞ্চিত করে? তাহলে প্রকৃতির সন্তান হয়ে আমরা কেন তা করছি? গাছপালা নিজে না খেয়ে তার সব ফল-ফুল দিয়ে সমগ্র জীবজগতের সেবা করছে। একটা আমগাছ কখনো বলে না যে আমার ফল শুধু মেয়েরা খাবে, ধনীদের টেবিলে শোভা পাবে। বরং তা পাখি, বাদুড়, মানুষ সবাই সমানভাবে ভোগ করছে। দস্যু-পতি যে-ই হোক, সবাই আমরা প্রকৃতির সুফল ভোগ করছি, প্রকৃতির সবকিছু যেন মানুষের কল্যাণেই বৈষম্যহীনভাবে নিরন্তর সেবা দিয়ে যাচ্ছে। আমরা কী দিয়ে প্রকৃতির সেবা করছি, কখনো ভেবেছি সে কথা?

প্রকৃতি আমাদের জীবনদায়ী অক্সিজেন দিচ্ছে, আর আমরা প্রকৃতির বায়ুমণ্ডলে ছাড়ছি বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড। এ গুরুত্বপূর্ণ কথাটা কি আমরা ভাবি কখনো? আমাদের এই বিষাক্ত বায়ুর কারণেই পৃথিবী আজ ত্রিসংকটের মুখে পড়েছে—পরিবেশদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি। এর সবকিছুর জন্য পৃথিবী নিজে যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী মানুষ, মানুষের অপরিবেশসুলভ কর্মকাণ্ড। জাপানি দার্শনিক ও লেখক কৃষিবিদ মাসানোবু ফুকুওকা ঠিকই বুঝেছিলেন, তিনি তাঁর ‘ওয়ান স্ট্র রেভল্যুশন’ বইয়ে লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীর সব সংকটের মূলে রয়েছে মানুষের অতিরিক্ত ভোগস্পৃহা।’ কথাটা একবার ভালো করে চিন্তা করে দেখুন, অধিক ভোগকে যদি আমরা বিসর্জন দিয়ে প্রাকৃতিক সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে পারতাম, তাহলে আমাদের মধ্যে বিভেদ যেমন কমত, তেমনি পরিবেশদূষণও অনেক কমে যেত। বিলাসী জীবনের জন্য আমাদের এত কলকারখানার দরকারই হতো না।

কলকারখানা ও যানবাহন এখন আমাদের জীবনযাপনের অপরিহার্য অঙ্গ, যা থেকে বিপুল বায়ুদূষণ ঘটছে। শুধু বায়ুদূষণের কারণেই পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। ভাবা যায় এ কথা? বায়ুদূষণে ঢাকা শহর কেন বারবার পৃথিবীর শীর্ষ রাজধানীগুলোর মধ্যে জায়গা পাচ্ছে? এসব কারণে মানুষসহ জীববৈচিত্র্যের যেসব ক্ষতি হচ্ছে, তার মূলেও রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর ধরন সাম্প্রতিক দুই দশকে যতটা বদলে গেছে, তা গত ৭০ বছরেও বদলায়নি। চিন্তাটা এ কারণেই বেশি হচ্ছে। কেন এমন সময়ে-সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে? ফুল ফোটার সময় বদলে গেছে। পোকামাকড়ের আচরণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

আইনস্টাইন একটা চমৎকার ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন, বলেছিলেন, পৃথিবীতে মানুষ না থাকলেও প্রকৃতি ও গাছপালা থাকবে। কিন্তু গাছপালা না থাকলে মানুষ থাকবে না। পৃথিবীর সব মৌমাছি মরে গেলে মানুষ বড়জোর চার বছর বাঁচবে। কী ভয়াবহ কথা! পোকামাকড়দের অনেকেই গাছের ফুলে ফুলে মধু সংগ্রহের সময় পরাগায়ন ঘটায়, যে কারণে ফল ও বীজ হয়। তাই ওরা নেই মানে আমাদের খাদ্যও নেই। আহার ছাড়া মানুষ বাঁচবে কী করে?

যখন আমরা একা থাকি, তখন মনে হয় যেন কোনো কিছুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই, কাউকে আমার দরকার নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা প্রত্যেকেই আমাদের পরিবেশে থাকা প্রতিটি জীবের সঙ্গে এক অদৃশ্য মধুর বন্ধনে আবদ্ধ। এ সম্বন্ধের শিকলের কোথাও একটু টান পড়লে বা ছিঁড়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে অন্য জীবের ওপরেও। আর যদি কোনো জীবপ্রজাতি সম্পূর্ণ পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যায়, তাহলে তার ওপর নির্ভরশীল অন্তত আরও ৩০টি প্রজাতির জীবের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু এ মহাসত্যকে বিজ্ঞানীরা মানলেও সাধারণ মানুষ বোঝে না, মানেও না।

পৃথিবীতে যেন এখন সার্কাস চলছে। সং সেজে আমরা সব নিখুঁত অভিনয় করে যাচ্ছি, ঠকাচ্ছি, ঠকছি—যার যা ইচ্ছে করে যাচ্ছি, এসব কাজের পরিণতির কথা ভাবছি না। এমনকি অনেকে আমরা পরিণতির কথাগুলো জানলেও বিশ্বাস করছি না। একবারও ভাবছি না যে প্রকৃতির এই পারস্পরিক বন্ধনই পুরো মানবজাতির অস্তিত্বের ভিত্তি। কী করেইবা ভাবব? বর্তমান পৃথিবী সহিংসতা ও স্বার্থবাদিতায় পূর্ণ। সম্পত্তি, সুনাম, স্বজনচিন্তা আমাদের বিভোর করে রেখেছে। সেখানে প্রকৃতি ও পরিবেশকে নিয়ে ভাববার অবকাশ কোথায়?

আবারও ফিরে আসি শুরুর কথায়, বলছি যে মানুষের মধ্যে জাতি ও গোষ্ঠীগত বিরোধ, দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা আজ পুরো পৃথিবীকে শেষ করে দিচ্ছে। ক্রমাগতভাবে কম শক্তিশালীরা আরও শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্পদের লোভ ও ভালো থাকার নেশা আমাদের প্রত্যেকের মনে প্রবলভাবে চেপে বসেছে। এ যেন ডারউইনের যোগ্যতমের ঊর্ধ্বতন নীতির অনুসরণ। শক্তিশালীরাই কেবল পৃথিবীতে টিকে থাকবে, দুর্বলরা হারিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজ আর জলবায়ু সংকট দুর্বল বা শক্তিশালী বলে বিভেদ করছে না। আজ যেসব দেশ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও শক্তিমত্তা বজায় রাখার জন্য যেসব অপকর্ম করে যাচ্ছে, তার ফল তো সবাই আমরা ভোগ করছি। এ থেকে মুক্তি কী? মুক্তির একটাই পথ—নিজেকে বদলানো, শোধরানো। একজন মানুষের নিজেকে পুরো মানবজাতি হিসেবে চিন্তা করা।

পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও প্রকৃতির সঙ্গে পুনঃসংযোগ স্থাপন করাটা এখন খুবই জরুরি। মাঝেমধ্যে সন্তানদের নিয়ে, পরিবার নিয়ে কিছুক্ষণ গাছপালা, বনজঙ্গল ও পাহাড়-পর্বতে হাঁটুন, নদীতে বেড়ান, বিলে ফোটা শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করুন, রাতের বেলা জ্যোৎস্নায় ভিজুন, বৃষ্টির জলের ধারা কতটা প্রখর ও ঋজু, তাতে ভিজে সে উপলব্ধিটুকু নেওয়ার চেষ্টা করুন, রাতের লেবুবনে জোনাকির মিটিমিটি আলো দেখে বিস্মিত হোন। মানুষকে জ্ঞান দেওয়া ও বই পড়ানোর চেয়ে তাদের অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি প্রতিটি মানুষের কর্তব্য ও দায়িত্ব কী হবে, সেটি বোঝা দরকার। পৃথিবীর প্রকৃতি রক্ষায় সচেতনতা, অনুভূতির জাগরণ ও একাত্মতাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কখনোই সুদৃঢ় নয়: উম্মে ওয়ারা

বিড়ম্বনাময় এবারের ঈদযাত্রা

সংস্কৃতি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি

উষ্ণ পৃথিবীর শীতল সতর্কতা

মবের শাসন, মানুষের ভয়, রাষ্ট্রের নীরবতা

শিশুর নিরাপত্তায় সরকারের অবস্থান কী

যুদ্ধ বন্ধ করতে ইউরোপ কি এগিয়ে আসবে

স্বাধীনতাসংগ্রামের একজন কিংবদন্তি

সমীকরণ বদলাবে কি আঞ্চলিক সম্পর্কের

বাংলাদেশের অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ