হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মানুষ কী করে বাঁচবে

মামুনুর রশীদ নাট্যব্যক্তিত্ব

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার কারণে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছেন। ফাইল ছবি

মানুষ সংঘবদ্ধভাবে নানা লড়াই ও সংগ্রামের পর একটি রাষ্ট্র নির্মাণ করে। একটি সীমানার মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও আয়ের মানুষ তাদের প্রয়োজনমতো জীবিকার নিশ্চয়তা চায়। মানুষ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকে একটি সরকার, যারা সাধারণত জনগণের ভোটেই নির্বাচিত হয়। এখানেই সমস্যার শুরু।

রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বলে তাঁরা স্বাধীনভাবে মেধা ও বুদ্ধি খাটিয়ে রাষ্ট্রের আইনগুলো কার্যকর করে থাকেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের কাজের তদারকি ও রাষ্ট্রের আইনকানুন যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা দেখাশোনা করেন।

রাষ্ট্রের কাজই হচ্ছে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করা। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে, অন্যভাবে মৃত্যুবরণ করলে বা কর্মসংস্থান না থাকলে দেশে আন্দোলন, অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়। সে জন্য যেকোনো সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ন্যায়সংগত অধিকার। এই ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের জন্য যুগ যুগ ধরে প্রতিবাদী মানুষ আন্দোলন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। ফলে আন্দোলন করে কখনো সরকারের পতন হয়।

এরপর রাষ্ট্র নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করে থাকে। পৃথিবীর কিছু কিছু রাষ্ট্র এসব মেনে চলে এবং সর্বোচ্চ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নিজেদের নিয়োজিত করে। কিন্তু এর মধ্যে অধিকাংশ রাষ্ট্রেই এসব মান্য করা হয় না। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি মানুষের জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তবে আজকের দিনে প্রতিবাদের সীমাবদ্ধতাও আছে। মানুষ নানা কারণে বিভক্ত। সেই বিভাজিত জনগোষ্ঠী একত্র হয়ে কোনো আন্দোলন রচনা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। যেসব দেশের অর্থনীতি দুর্বল, মানুষের আয় সীমিত, সেসব দেশের ব্যবসায়ীরা তখন দায়িত্বহীন ও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। আর যদি সেই শ্রেণির বিপক্ষে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারে, তখন মানুষের অসহায়ত্বের আর শেষ থাকে না। এই ব্যবসায়ীরা জনগণের দুঃখ-কষ্টের কথা চিন্তা না করে, ছোট-বড় নানা ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করেন। সিন্ডিকেটের যারা অংশ, তারা দ্রুত বিপুল অর্থের মালিক হয়ে যায়।

আমরা অবশ্য আশাই ছেড়ে দিয়েছি, এই রাষ্ট্রের পক্ষে ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে দেখা যায় একজন ম্যাজিস্ট্রেট কয়েকজন পুলিশ নিয়ে কিছু কিছু জায়গায় যান, তা-ও কালেভদ্রে। দেশে অসংখ্য ম্যাজিস্ট্রেট আছেন তারপরেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। মোবাইল কোর্টকে কেন সব সময়ের জন্য সক্রিয় করা যায় না? যাতে সিন্ডিকেটওয়ালারা রণে ভঙ্গ দিতে পারে। জেল-জরিমানার অঙ্কও এমনভাবে বাড়ানো উচিত, যাতে করে যেন কোনো অবস্থাতেই তারা অন্যায় কাজে আর যুক্ত হতে না পারে।

জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে ভোক্তাশ্রেণির জীবনমান ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে। ফলে পুষ্টির অভাবে বা পুষ্টিস্বল্পতার কারণে একটা শ্রেণি ক্রমাগতভাবে ছিন্নমূলের কাতারে চলে যাচ্ছে। আমাদের দেশে ছিন্নমূল হওয়ার অনেক প্রক্রিয়া আছে। যেমন মানুষ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নদীভাঙন, বেকারত্বের কারণে এ কাতারে চলে যেতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে এনজিওর খপ্পরে পড়ে এবং মহাজনদের কাছ থেকে অধিক সুদে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত দ্রব্যমূল্যের কারণে অনেক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের পক্ষে শহরের বস্তিতে থাকাও সম্ভব হচ্ছে না।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর বহু শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে কর্মরত বহুসংখ্যক কর্মী বেকার হয়ে পুনরায় গ্রামে ফিরে গিয়ে অনাহারক্লিষ্ট জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে সিন্ডিকেটের কল্যাণে যেভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে, সেখানে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়ছেন। যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বহু বছর ধরেই একটা প্রবণতা লক্ষণীয়, ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। অধিকাংশ ব্যবসায়ী নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যকে সুসংহত করার জন্য রাজনীতিতে এসেছেন। বিপুল অর্থের বিনিময়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রকৃত রাজনীতিবিদদের দেশ সেবার পথকে রুদ্ধ করছেন। তাঁরা সংখ্যায় যেমন বিপুল, তেমনি তাঁদের শোষণ করার নানা উপায়ও চতুর্দিকে প্রসারিত।

যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দেশপ্রেমের ভাব নিয়ে একটি এনজিওবাদী সরকার ১৮ মাস রাজত্ব করে দেশের প্রতি এক চরম শত্রুতার পথ বেছে নিয়েছিল। নানা ধরনের চুক্তির জালে দেশকে এরা বেঁধে ফেলেছিল এবং কারণে-অকারণে মানুষকে নিপীড়ন করেছিল। আজকে ঢাকা শহরে যে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রচালিত অটোরিকশা দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে আছে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার ঋণের জাল। উচ্চ সুদের বিনিময়ে বিপুল দরিদ্র শ্রেণিকে তিনি বেঁধে ফেলেছেন। ঋণের কিস্তিতে অসহায় হয়ে কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে বিভিন্ন শহরে এসে পরিবারের প্রধান ব্যক্তিরা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবস্থা করে কোনোমতে বেঁচে আছেন। এই পেশা বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, এতে কোনো লাইসেন্স লাগে না, প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই এবং আইনকানুনের কোনো ধার ধারতে হয় না। আগে পায়ে চালিত রিকশার জন্যও সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সের দরকার হতো, এদের ক্ষেত্রে তা-ও নেই। ফলে এরা দায়িত্বহীন শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। শহরের রাজপথগুলো ক্রমাগতই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এই চালকদের অধিকাংশই অশিক্ষিত, এরা নানা কারণেই কোনো শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেননি। রাষ্ট্রের আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো মানুষকে শিক্ষা দেওয়া, যে শিক্ষা মানুষকে দায়িত্বশীল করে তোলে। এ ক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রের রয়েছে বিরাট এক দায়িত্বহীনতা। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে একেবারে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত নানা ধরনের ভুল শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। ফলে এই শিক্ষা মানুষকে দায়িত্ববান করে না, পারস্পরিক সম্পর্ক বাড়ায় না বরং দলীয়করণের ফলে প্রতিহিংসার শিক্ষা ভালোভাবে রপ্ত করা যায়। ফলে আমরা প্রায় প্রতিদিনই খবরের কাগজে বা বিভিন্ন মাধ্যমে এই প্রতিহিংসার সংবাদ দেখতে পাই।

আবার সরকার বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তকও বদলে যায়। তবে বদলানো হয় যুগোপযোগী করার জন্য নয়, নিজেদের প্রয়োজনে। এখান থেকেই জাতীয় ঐক্য নষ্ট হয় এবং সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষাকে রাজনীতি-নিরপেক্ষ করলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও অনেক সুসংহত হতো। কিন্তু এই বিষয়টিকে কোনো সরকারই কখনো গুরুত্ব দেয়নি। শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতিসচেতনও যে করা প্রয়োজন, তা-ও তারা কখনো ভাবে না। একটি দেশে যদি বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতি থাকে, তাহলে সে দেশে জাতীয় ঐক্য কী করে নির্মাণ করা সম্ভব? আর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যে নৈরাজ্য চলমান, তার বড় উদাহরণ হলো সম্প্রতি হামের কারণে শত শত শিশুর মৃত্যুর ঘটনা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দায়িত্বহীনতাকে এখন দায়ী করা হচ্ছে। এদের অমানবিক শাসন এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে নির্মম অজ্ঞতা মানুষকে শুধু শোষণ করার জন্য দায়ী। সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে কোনো মানবিক কারণে কোনো সঠিক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। শান্তির জন্য নোবেল বিজয়ী এই ব্যক্তি আজও দেশে অশান্তির কারণ। সুদূর ভবিষ্যতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

পশ্চিমা দেশের মূর্খপণ্ডিত এবং আগ্রাসী যুক্তরাষ্ট্র এসব লোকের জন্ম দিয়েছে, যাঁরা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে একমুহূর্তও ভাবেননি। নিকট অতীতেও আমরা দেখেছি স্বাস্থ্যব্যবস্থা খুবই পশ্চাৎপদ এবং নাজুক ছিল। তার মধ্যে সংকট এলে নির্বাচিত সরকার ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং মানুষকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আজকে শিশু হত্যার জন্য বর্তমান সরকারের উচিত, যাঁরাই এর জন্য দায়ী তাঁদেরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় নিয়ে এসে বিচার করা। তা না হলে রাষ্ট্র একটা বড় ধরনের দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেবে। যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাঁরা ক্লান্তিহীন থাকার কথা। তাঁদের চোখে ঘুম থাকার কথা নয়। প্রতিনিয়ত অন্যায্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের সদা জাগ্রত থাকার কথা। তাঁদের দেখে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা স্বীয় দায়িত্ব পালনে সব সময় কর্মচঞ্চল থাকবেন। বর্তমান অবস্থায় বারবার একটি কথাই মনে হয়, মানুষ কী করে বাঁচবে এত অন্যায় নিয়ে। এত সীমাহীন দুর্নীতি থাকলে মানুষ তো আবারও দিশেহারা হয়ে পড়বে। মানুষের বাঁচার কি কোনো উপায় রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে না? নাকি আমরা আবারও আশাহীন হয়ে পড়ব?

সম্ভাবনার পথ কি দেখাবে এবারের শিক্ষা বাজেট

বিশ্বজুড়ে ডানপন্থার উত্থান

চিকিৎসাব্যবস্থা কবে স্বস্তির হবে

ট্রাম্প কি আবার ইরানে সংঘাতে জড়াবেন

থালাপতির উত্থানের নেপথ্য: ভারতের স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব

হরমুজ প্রণালি সংকট: খাদ্যনিরাপত্তা ও উৎপাদনে বহুমাত্রিক ঝুঁকি

মুগ্ধকারিণীর নৃত্য

বিচ্ছিন্নতা পশ্চাৎপদতাও বটে

লালমনিরহাট বিমানবন্দর: আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনাময় কেন্দ্র

ট্রাম্প-সি বৈঠকে বিশ্ববাসী নতুন কিছু পাবে কি