হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

দেশে কি একটা বড় তরুশালা হবে

মৃত্যুঞ্জয় রায় 

বিশ্বের সেরা প্লান্ট কনজারভেটরি লন্ডনের কিউ গার্ডেন। ছবি: সংগৃহীত

কেন জানি না গত বছর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় বৃক্ষমেলাকে অনেক বেশি ভালো লেগেছিল। এর একটি প্রধান কারণ—বেশ সুসজ্জিত মনোরম ও পরিপাটি করে গাছপালা দিয়ে সাজানো, মনে হচ্ছিল যেন এক চমৎকার প্লান্ট কনজারভেটরিতে এসে পড়েছি। কিছু কিছু নার্সারির সামনে চমৎকার ল্যান্ডস্কেপ করা হয়েছে। কেউ যদি তাঁর বাড়িতে এ ধরনের ছোট একটা নান্দনিক উদ্যান করতে চান, তাহলে সেখান থেকে আইডিয়া ও পরামর্শ নিতে পারেন, উপকরণও মিলতে পারে। এমন সবুজ কোমল ঘাসের লন, ওয়াকওয়ে, জলাধার, কটেজ—নান্দনিক শোভাময়ী সব বাহারি গাছপালা! কী চমৎকার সব কাজ আমাদের তরুশিল্পীদের, দেখে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এত মেধা ও শৈল্পিক রুচির মানুষ এ দেশে থাকতে আমাদের কেন বিদেশের মতো একটা বড় তরু সংগ্রহশালা তথা প্লান্ট কনজারভেটরি হলো না, সেটাই আক্ষেপের বিষয়।

জাতীয় বৃক্ষমেলার মতো বিদেশে অনেক গাছপালা সাজিয়ে এ রকম পরিপাটি করে স্থায়ীভাবে রাখা হয়। সেগুলোকে বলা হয় প্লান্ট কনজারভেটরি। আমাদের দেশে আছে বোটানিক্যাল গার্ডেন, কিন্তু বিদেশের মতো সুসংরক্ষিত এরূপ কোনো প্লান্ট কনজারভেটরি নেই। ইউরোপ ও আমেরিকার বেশ কয়েকটি প্লান্ট কনজারভেটরি দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গিয়েছিল, যেমন তার পরিকল্পনা, তেমন তার নকশা আর সারা বিশ্বের হাজার হাজার প্রজাতির গাছপালা সেখানে তুলে আনা হয়েছে। একেক অংশ ভাগ করে বিশ্বের একেক অঞ্চলের গাছপালা সেখানে রাখা হয়েছে। আহা, দর্শন আর গবেষণার কী চমৎকার সুযোগ! সারা বিশ্ব ধরে তো আর ঘুরে ঘুরে সেখানকার গাছপালা দেখা যাবে না, কিন্তু এক ছাদের নিচে যদি এশিয়া, আফ্রিকা, আমাজন, ইউরোপ, আমেরিকার গাছপালা দেখা যায় তো তাতে দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে গাছপালা দেখার কষ্ট লাঘব হয়, সময় ও অর্থ দুই-ই বাঁচে। তা ছাড়া যে গাছ দেখতে চাইছি, সে দেশের কোথায় সে গাছ আছে কে জানে?

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গে গিয়ে ফিপস কনজারভেটরিতে যখন ঢুকেছিলাম, সারাটা দিনেও তার গাছপালা সব দেখে শেষ করতে পারিনি। সেখানে গিয়ে যখন আমাদের দেশের কলাগাছ, আমগাছ, কুলগাছ ও পেয়ারাগাছে ফল ধরা দেখলাম, পেঁপেগাছে ঝুলছে বড় বড় পেঁপে, শত শত লালরঙা কালো জবা ফুল ফুটে রয়েছে, তখন মনে হলো আমেরিকায় বসে যেন বাংলাদেশকেই দেখছি। যাঁরা উদ্ভিদশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করেন, বইপত্রে ছবি দেখে দেখে সেসব গাছপালা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন, সেসব গাছ যদি এমন বাস্তবে চোখের সামনেই ছুঁয়ে দেখা যায় তাহলে তার আনন্দটাই হয় অন্য রকম।

এ দেশে একটা জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান আছে, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছোট ছোট উদ্ভিদ উদ্যান আছে। ছোট ছোট কিছু কাচের ঘরও গাছপালা রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে। বোটানিক্যাল গার্ডেন ও প্লান্ট কনজারভেটরির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো, বোটানিক্যাল গার্ডেন সাধারণত খোলা ও অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে গড়ে তোলা হয়। প্লান্ট কনজারভেটরিও একধরনের বোটানিক্যাল গার্ডেন, তবে প্রকৃত বোটানিক্যাল গার্ডেন না। এগুলো খোলা পরিবেশে হয় না, হয় কাচের ঘরে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। সত্যি বলতে কি, দেশে এখন পর্যন্ত সুসংবদ্ধ রীতিদুরস্ত কোনো বড় তরুশালা গড়ে ওঠেনি।

প্লান্ট কনজারভেটরি বা তরুশালাগুলো হয় সাধারণত কাচের ঘরের ভেতর, যেখানে যেসব উদ্ভিদ রাখা হয় সেসব উদ্ভিদের উপযুক্ত পরিবেশ ও আবহাওয়া বজায় রাখা হয়। এগুলো তৈরি করা হয় শুধু দেশ-বিদেশের গাছপালাগুলোকে রাখার ভান্ডারের জন্য না, বরং সেসব গাছপালার বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার জন্য সর্বোত্তম আরামদায়ক পরিবেশ প্রদান করা হয়। গাছপালাগুলোকে তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদা আলাদা পরিবেশে লাগানো হয়। যেমন তালজাতীয় গাছের জন্য পাম হাউস, অর্কিডের জন্য অর্কিড হাউস, মরুভূমির উদ্ভিদের জন্য ডেজার্ট হাউস, উষ্ণমণ্ডলীয় উদ্ভিদের জন্য ট্রপিক্যাল হাউস, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের উদ্ভিদের জন্য মেডিটেরানিয়ান হাউস ইত্যাদি। আগত দর্শনার্থীরা আবার সেসব দেখে যাতে আনন্দ পায়, সে জন্য সেসব তরুশালায় নানা রকমের সৌন্দর্যও সৃষ্টি করা হয়। শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে উদ্ভিদসংক্রান্ত অনেক বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান লাভ করতে পারে, গবেষকেরাও পান তাঁদের গবেষণার খোরাক।

এসব তরুশালার আর একটা বড় সুবিধা হলো সারা বছরই পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকায় গাছগুলো সেখানে ভালোভাবে টিকে থাকে। কোনো কোনো তরুশালায় নানা রকম অনুষ্ঠান আয়োজনেরও সুযোগ থাকে। খোলা স্থানে কখনো যেকোনো গাছ জন্মানো বা বাঁচিয়ে রাখা যায় না, শুধু স্থানিক পরিবেশের সঙ্গে মানানসই গাছপালাই রাখা যায়। কিন্তু তরুশালার ভেতরে চাইলে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে যেকোনো গাছই রাখা যায়।

লন্ডনের কিউ গার্ডেন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উদ্ভিদ সংগ্রহশালা। সেখানে প্রায় ৩০ হাজার প্রজাতির ৮৫ লাখ উদ্ভিদ রয়েছে। সে গার্ডেনে তিনটি প্রধান কনজারভেটরি রয়েছে। একটিতে আছে পাম হাউস, যা ১৮৪০-এর দশকে নির্মিত। সেখানে উষ্ণমণ্ডলীয় উদ্ভিদগুলোকে রাখা হয়েছে। টেম্পারেট হাউসে রাখা হয়েছে শীতপ্রধান দেশের উদ্ভিদ। এটি নির্মিত হয়েছিল ১৮৫৯ থেকে ১৮৯৮ সালের মধ্যে, যেখানে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রজাতির শীতপ্রধান অঞ্চলের উদ্ভিদ। তৃতীয় কাচের ঘরটিতে রয়েছে ১০টি কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত ১০টি অণু-পরিবেশ ও সে পরিবেশের উদ্ভিদরাজি। এ ছাড়া আছে জলজ উদ্ভিদের সংগ্রহশালা। আছে আলপাইন হাউস, যেখানে অনেক লম্বা লম্বা গাছ আছে।

দেশের ভেতরে এমন বড় বড় কনজারভেটরি তো বটেই, এমনকি বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরের মধ্যে ছাউনি দেওয়া কাচঘরের মধ্যেও জীবন্ত গাছের উদ্যান বানানো হয়েছে। সম্প্রতি দোহা হামাদ ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরের মধ্যে দেখে এলাম প্রায় ৬ হাজার বর্গমিটারের একটি উদ্যান। সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরেও দেখেছি এমন নান্দনিক উদ্যান। তবে একে ঠিক প্লান্ট কনজারভেটরি বলা যাবে না। নিয়ন্ত্রিত ঘরে গাছপালা জন্মালেও আমেরিকার সবচেয়ে বড় উদ্ভিদ সংগ্রহশালাটি রয়েছে নিউইয়র্কে।

আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্যানটি হলো ঢাকার মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান। এ দেশে প্রায় ৬ হাজার প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। কিন্তু সেই বড় উদ্যানটিতেও হাজারখানেক প্রজাতির বেশি গাছপালা নেই। তারপরও সেগুলোকে আমাদের আঞ্চলিক গাছপালা অথবা ট্যাক্সোনমিক শ্রেণি অনুযায়ী সাজানো নেই। ফলে গাছ খুঁজতে হয়রান হতে হয়। গাছ অনুসন্ধানের জন্য নেই সুসংগঠিত কোনো ব্যবস্থা। অথচ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মতো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছগুলোতেও এমনভাবে ট্যাগিং করা হয়েছে যে সেগুলোর কিউআর কোড স্ক্যান করলেই তার সব তথ্য বেরিয়ে আসে। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের মতো একটি উদ্যানেও কি এমন ব্যবস্থা করা যায় না? আমরা সেখানে গেলে পাহাড়ের গাছপালাগুলোকে আলাদা কোনো জায়গায় দেখি না, লোনা অঞ্চলের উদ্ভিদ বা খরাপীড়িত অঞ্চলের গাছ কোনগুলো, সেগুলোকেও আলাদাভাবে দেখার সেখানে কোনো সুযোগ নেই। নামে একটা আন্তর্জাতিক বাগান সেখানে আছে বটে, কিন্তু সেটিও সুচিহ্নিত নয়। দরকার ছিল আঞ্চলিক তরুসজ্জা। আর এ জন্যই দরকার একটি সুনিয়ন্ত্রিত সেসব আঞ্চলিক তরুর পরিবেশ তৈরির জন্য আবদ্ধ স্থান। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান হোক বা অন্য কোথাও হোক, আমরা কি এ রকম একটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গাছপালায় সমৃদ্ধ তরুশালা গড়ে তুলতে পারি না?

ন্যাশনাল হারবেরিয়াম মরা গাছপালার জায়গা। কিন্তু জীবন্ত গাছের সঙ্গেও রয়েছে তার নিবিড় সম্পর্ক। জীবিত গাছ না হলে মরা গাছের নমুনা তৈরি করে হারবেরিয়ামে রাখা যায় না। তাই এ ধরনের একটি উদ্ভিদ সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে পারলে পরোক্ষভাবে ন্যাশনাল হারবেরিয়ামেরও উপকার হবে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিদ্যা পড়ানো হয়, সেসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেও সীমিত আকারে হলেও এ ধরনের প্লান্ট কনজারভেটরি প্রতিষ্ঠা করা যায়। প্রকারান্তরে সেগুলোর প্রতিটিই এক একটি জার্মপ্লাজম সেন্টার হিসেবে কাজ করবে। আমার মনে হয় উদ্ভিদবিশারদ, নার্সারিকর্মী, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও সরকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। যেকোনো দেশের ও অন্য দেশের উদ্ভিদ সম্পদ রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

পরিবর্তনের জন-আকাঙ্ক্ষা এবং পূর্ববর্তী ঘটনার জের

ক্রিকেট আজ গভীর খাদে

আচরণবিধি, ইসির পক্ষপাত ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

ব্যালট বাক্সে নতুন বাংলাদেশ

নির্বাচন-পরবর্তী নেতাদের করণীয় কী হওয়া উচিত

কেন ব্যর্থ হলো পুলিশ সংস্কারের উদ্যোগ

সরস্বতীর শাস্ত্রীয় গুরুত্ব

শত বছর পরেও শিখাগোষ্ঠীর প্রাসঙ্গিকতা

ন্যাটো কি ভাঙনের মুখে

ইরান ভেঙে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের পরিণতি কী হবে