সেবার দেশ থেকে ফিরছিলাম। চট্টগ্রাম বা দেশ ছেড়ে আসা মানেই কষ্ট, বুক ভারী হয়ে থাকা। ঢাকার এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট দিয়ে হাসি হাসি মুখ করার চেষ্টা করে বলেছিলাম: হ্যালো। কোনো জবাব দিলেন না। একটু উঁচু কাউন্টারে বসা অফিসার ক্যাঙারু ছাপের পাসপোর্ট একবার এদিক, একবার ওদিক করতে করতে ঘন ঘন পাশের সিটে বসা ততোধিক গম্ভীর লোকটির সঙ্গে কী যেন বলছিলেন। আমি যত বলি তবে, এবার যে যেতেই হবে... কিছু বলেন না।
৫-১০ মিনিট পর জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওদিক থেকে এসে এদিক হয়ে সিডনি যাচ্ছেন?’
ওদিক মানে প্রতিবেশী দেশ, এদিক মানে জন্মভূমি আর যাচ্ছি আবাসভূমি সিডনি। আমি কঠিন কিছু বলার আগে চেহারা দেখে বলে ফেললেন, ‘না, এখন এ দেশে “দাশগুপ্ত” দেখা যায় না তো, তাই বলছিলাম...।’ নিজ দেশে এই হলো ট্রিটমেন্ট!
সেদিন রাতে বিলম্বিত ফ্লাইটে মধ্যরাতের পর এসে পৌঁছালাম শ্রীলঙ্কার এয়ারপোর্টে। ঢুকে এগোতে এগোতে দেখি তথাগত বসে আছেন। মূর্তিমান সুস্থির। ভরসা হলো মনে। রাতজাগা ইমিগ্রেশন অফিসারগুলোর চোখে ক্লান্তি হলেও মুখে হাসি। আমাকে ডাকতেই সামনে গিয়ে পাসপোর্ট বের করে ব্যাগ থেকে ভিসার কাগজপত্র বের করছিলাম। মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘কোনো দরকার নেই স্যার। কম্পিউটারেই আছে সব।’ প্রথমবার তাদের দেশে আসার জন্য ভালোবাসা জানিয়ে ২ মিনিটের ভেতর ছাপ মেরে বিদায় দিলেন।
গভীর রাতে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির চালক ও গাইড আমার স্ত্রী দীপার গলায় মালা ঝুলিয়ে স্বাগত জানালেন। আমিও পেলাম একখানা। কিন্তু এই রাত গভীরে ভদ্রলোক আমাদের হোটেলের রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। মধ্যরাত পেরিয়ে যাওয়া রাস্তায় বেশ কিছু মানুষকে জিজ্ঞেস করছিলেন তিনি। আমরা ভয় পেলেও দেখলাম সবাই কেমন ভদ্র আর সাহায্য করতে আগ্রহী। শেষমেশ এক তরুণ পুলিশ অফিসার হাত দেখিয়ে থামালেন। একবারও আমাদের কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। তাঁরা দুজন পরিমিত কণ্ঠে তাঁদের ভাষায় কথা বলে একে অপরকে গুডনাইট বলে বিদায় নিলেন।
বাড়ির পাশে এমন একটা দেশ আছে, এটা সত্যি ভাবিনি। প্রায় ৯৯ শতাংশ শিক্ষিত মানুষের দেশে মানুষগুলো দেখতে কালো; কিন্তু সুশ্রী আর মার্জিত।
আরও গল্প পরে হবে। এখন একটা মজার কথা বলে শেষ করি। দোকান, রাস্তা বা হোটেল—যেখানেই যাই, সবাই দীপার সঙ্গে ওদের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। ভাবে ওদের দেশেরই কোনো নারী। ব্রেকফাস্ট করার সময় ছবি তুলছিল এক তরুণী। ঠাট্টা করে তাকে বললাম এই ছবির ক্যাপশন হবে, ‘শ্যামল রং রমণীর সঙ্গে প্রাতরাশ।’
শুনে বেজায় খুশিমনে তরুণী একটা বড় কেসেল দিয়ে গেল পাতে। কেসেল মানে কলা আর কি!
দুই. উড়োজাহাজের মতো ক্লান্তিকর জার্নি দ্বিতীয় কিছু নেই। তা যদি হয় ১৩-১৪ ঘণ্টার, তো আরও ভয়াবহ। সেই মধ্যরাতে হোটেলের রুমে নিয়ে গিয়ে কেউ যখন বলে, ‘দেখ, তোমাদের কী ফার্স্ট ক্লাস রুম দিয়েছি’, তখন বলতে ইচ্ছা হয়, ‘তুই এখন যা, আমারে একটু শান্তিতে থাকতে দে!’
কিন্তু রুমের বিশাল পর্দা সরিয়ে কাচের ভেতর দিয়ে যা দেখাল, তাতে মুগ্ধ হওয়ার বিকল্প ছিল না। গর্জনশীল ভারত মহাসাগরের শান্ত ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছিল তীরে। দোতলা থেকেও যেন হাত বাড়ালেই ধরা যাবে সে তরঙ্গমালা।
পরদিন ঘুম ভাঙার পর সোজা চলে গিয়েছিলাম কয়েক হাত দূরে, এই সমুদ্রের কাছে। এখানকার নারীদের দেখলেই মনে হয়, এ দেশের শ্যামল রং রমণীর সুনাম শুনেছি। ওদের শাড়ির মতো ঢেউখেলানো থ্রি-পিস দেখলে মনে হয়, মন চায় চক্ষু না চায়, মরি এ কি তোর দুস্তর লজ্জা। বলা বাহুল্য, আমি এ বিষয়ে চক্ষু লজ্জাহীন।
সমুদ্র ও বালিকা দেখার ফাঁকে কৃষ্ণকায় সুঠামদেহী এক যুবক এসে দাঁড়াল কাছে। হাসির ফাঁকে দেখলাম দু-একটা দাঁতও মিসিং। বলিষ্ঠ যুবকটির গায়ে সাধারণ একটি হাফ হাতা শার্ট। হাঁটুর ওপর ভাঁজ করা লুঙ্গির মতো সারাঙ। লেখাপড়া যা-ই করুক না কেন চোস্ত ইংরেজি জানে, বলেও চমৎকার। সিডনি থেকে এসেছি জেনেও তার চোখে বিস্ময় দেখে জানালাম, মূলত আমি বাংলাদেশি।
কোনো ভনিতা ছাড়াই সে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে এল না বাংলাদেশ? কেন বাংলাদেশ বারবার ভুল করছে?’
কথাতে এটা স্পষ্ট, সে ক্রিকেট বোঝে এবং জানে। আমি শুধু জানতে চাইলাম বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কাদের ও চেনে। আমাকে বিস্মিত করে উত্তর দিল, ‘কাউকে চেনার দরকার নেই, একা সাকিব আল হাসানই যথেষ্ট।’ বলে, ‘আমাদের দেশের যুবক-যুবতীদের ভেতর এমন একজনও খুঁজে পাবেন না যে সাকিবকে চেনে না।’
রাগত হয়ে বলল, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট শুড অ্যাপলোজাইজ টু হিম অ্যান্ড ব্রিং হিম ব্যাক।’
আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি।
সামান্য এক সিসা ব্যবসায়ী ভিনদেশি যুবকের বুকজুড়ে আছে বাংলাদেশের সাকিব। আর আমাদের কথিত দেশপ্রেমীরা তাকে পাঠিয়েছে নির্বাসনে। মনটা হু হু করে উঠেছিল সাকিব, মাশরাফিসহ অনেকের জন্য। যারা দেশের কৃতী সন্তান হওয়ার পরও আজ অপমানিত, অবহেলিত।
ভারত মহাসাগরের নোনাজলের ঢেউ এসে ততক্ষণে আছড়ে পড়েছে পায়ের পাতায়। চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া শ্যামা মেয়েটির দোলায়িত নিতম্বের ছন্দ মনে করিয়ে দিল, আরে আমি তো বেড়াতে এসেছি। আমার তো এখন আনন্দে থাকতে হবে।
তিন. আমার মনে হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার পাশাপাশি সৌন্দর্যবোধ আর দেশপ্রেম না থাকলে কোনো জাতি এগোতে পারে না। শ্রীলঙ্কার শহরতলির বিচগুলোতে আমি পর্যটনের জন্য আসা তরুণীদের দেখেছি। দেখে মনে হয়েছে আমি সিডনির কোনো সৈকতে আছি। বিকিনি পরা নারীদের অবাধ সন্তরণ আর বালুকা বেলায় স্নানের দৃশ্য মনে করিয়ে দিয়েছে, এরা সভ্য দেশে আছে। কেউ চোখ তুলে তাকায় না। বিচের আশপাশে প্রচুর মানুষ ডাব-নারকেল, তোয়ালেসহ নানা ধরনের জিনিস বেচাকেনা করছেন। তাঁদের সময় নেই কারও স্নান দেখার। তাঁরা জানেন এরা তাঁদের ভাগ্য বয়ে আনে। বিদেশি ডলার, ইয়েন, পাউন্ড এনে দেয়। তাই তাঁরা এদের নির্ভয়ে আনন্দ উপভোগের সুযোগ করে দেন, যা আমরা পারিনি। পারিনি বলে পর্যটনও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
এবার যেটা চমকে দিয়েছে—একসময়কার ঘোর ভারতবিরোধী শ্রীলঙ্কানরা এখন ভারতপ্রেমী। রাস্তাঘাটে যেখানে যার সঙ্গে কথা হয়েছে, সবাই বলেছে চীনের হাত থেকে তাদের বন্দর আর ভূমি বাঁচাতে ভারত এসে দাঁড়িয়েছিল পাশে। এ দেশের তরুণ-তরুণীরা দ্রোহের পর রাস্তা থেকে বাড়ি ফিরে গেছে। তারা সুশাসন চেয়েছিল, নিজেদের আসন চায়নি। হয়তো এটিই তফাত, হয়তো এ কারণেই শ্রীলঙ্কা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
অজয় দাশগুপ্ত
অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট