হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ইশরাকের ঘটনা নেতাদের জন্য সতর্কবার্তা

পদত্যাগের মাধ্যমে কেউ সরকারি বা দলীয় পদ হারাতে পারেন। কিন্তু তাতে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় আইন ভাঙা হয়েছে কি না এবং সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয় না। আইনের শাসনের অর্থ ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য একই আইনি মানদণ্ড নিশ্চিত করা।

কামরুল হাসান

ইশরাকের ঘটনা ক্ষমতাসীনদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। ছবি: সংগৃহীত

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, রাজপথের আন্দোলন এবং মেয়র হওয়ার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজের একটি শক্ত পরিচিতি তৈরি করেছিলেন প্রয়াত মেয়র মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন। প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া ছিল তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার বড় অর্জন। কিন্তু সেই অর্জন ধরে রাখার মতো দায়িত্বশীলতার পরিচয় শেষ পর্যন্ত তিনি দিতে পারেননি। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তাঁর তৎপরতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক বিতর্কের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছে।

মাদক নির্মূলের উদ্দেশ্য খুবই ইতিবাচক, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এটি এখন দেশের জন্য প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। লাখো পরিবারের জন্য মাদক হয়ে উঠেছে অভিশাপের মতো। ভবিষ্যৎ প্রজন্মসহ অগণিত মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলেছে ভয়াবহ নেশার সামগ্রী। কিন্তু তাই বলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং বৈধ হলেও প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করা বেআইনি এবং নিয়মতান্ত্রিকতার সীমা অতিক্রমের শামিল নয় কি? নিশ্চয়ই ইশরাককে তারই খেসারত দিতে হয়েছে।

ইশরাক হোসেনকে সময়ক্ষেপণ না করে স্পষ্ট ভাষায় পদত্যাগ করতে বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারের অন্যদের জন্য সেই বার্তাটিই দিয়েছেন। আমাদের দেশে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেক বাড়াবাড়ি, অনিয়মই উপেক্ষিত হয়ে থাকে। সে বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত বলা যেতে পারে। ইশরাকের ঘটনা ক্ষমতাসীনদের জন্য আসলেই একটি বড় সতর্কবার্তা। আর সেই বার্তাটি হলো, সীমা ছাড়িয়ে গেলে তার মূল্য দিতে হবে।

তাই ঢাকা-৬ আসনের সাংসদ ইশরাক হোসেনের ঘটনার তাৎপর্য কেবল একজন প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের (স্বাভাবিকভাবেই অঙ্গ সংগঠনও) নেতা ও মন্ত্রীরা ক্ষমতা প্রয়োগে কোন পর্যন্ত যেতে পারবেন এবং মাত্রা ছাড়ালে কী পরিণতি হতে পারে, সে ব্যাপারে একটি অলিখিত কিন্তু স্পষ্ট নির্দেশনা তুলে ধরেছে।

মাদকের বিস্তার যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজের পক্ষ থেকে সর্বশক্তি দিয়ে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও বাহিনীর পাশাপাশি নাগরিক সমাজকে মাদকবিরোধী প্রচারণা ও অভিযানে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। তবে মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রথমত রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব। এবং সে ব্যবস্থা নেবে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। উদ্দেশ্য ভালো থাকলেই যে কেউ যেকোনো পদ্ধতিতে এ কাজে লিপ্ত হতে পারেন না। একজন প্রতিমন্ত্রী নিজে কেন আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদক কারবারের আখড়ায় অভিযান পরিচালনায় অংশ নেবেন? এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব প্রয়োজনে অপরাধ দমনকারী সংস্থাকে সহায়তা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা। সে গণ্ডি পেরিয়ে তিনি নিজেই আইন প্রয়োগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন কি? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে সাংসদ বা তাঁর সমর্থকদের পক্ষ থেকে শুধু মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থানের কথা বলে গেলে মূল বিতর্ক আড়াল করা হবে।

পদত্যাগের ঘোষণার আগে ও পরে ইশরাক হোসেন বলেছিলেন, আত্মরক্ষার জন্য তিনি লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে নিয়েছিলেন। তাঁর কাছে খবর ছিল ঘটনাস্থলে সশস্ত্র অপরাধীদের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন। তাঁর এই বক্তব্য তদন্তে বিবেচনায় নিতে হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছিল। সেই অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, কর্তৃত্ববাদী আচরণ ও জবাবদিহিহীনতার অবসান। চব্বিশে দেশের মানুষ শুধু শাসকের পরিবর্তন চায়নি; রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি দীর্ঘ ১৯ বছর পর ক্ষমতায় ফিরেছে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। বিদেশ থেকে ফিরে দলের হাল ধরা তারেক রহমান বিভিন্ন দৈনন্দিন আচরণে প্রশাসনের, প্রটোকলের অচলায়তন ভেঙে কৃচ্ছ্রতা, সৌজন্য ও সদিচ্ছার কিছু ছোট ছোট নজির প্রায়ই দেখাচ্ছেন। কিন্তু মন্ত্রিসভার বাকি সদস্য ও সরকারি দলের অন্য নেতাদের আচরণে তার কতটা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে? প্রশ্নটা ইতিমধ্যে বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে। রাজনীতি ও সরকারে বিএনপির পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন জনগণ দেখতে চায়। তারা দেখতে চায়, বিরোধী দলে থাকার সময় যে ক্ষমতার অপব্যবহারের সমালোচনা করা হয়েছে, নিজেরা ক্ষমতায় এসে সে পথেই হাঁটছে না দলটি। সেটা ঘটলে পরিবর্তনের সব দাবি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।

ইশরাকের বাবা সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর ছেলের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হওয়াটা তাই অনেকটাই যৌক্তিক ছিল। বাবার গড়ে যাওয়া শক্ত রাজনৈতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই ইশরাক নিজের অবস্থান তৈরি করেন। ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রথম বড়ভাবে পাদপ্রদীপের আলোর নিচে আসেন। পরে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাঁকে মেয়র ঘোষণা করার ঘটনা ইশরাকের নাতিদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এক মাইলফলক। কিন্তু মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে তাঁর সমর্থকদের আন্দোলন একপর্যায়ে নগর ভবন ঘেরাও, ফটকে তালা দেওয়া এবং দীর্ঘদিন নাগরিক সেবাদান ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় গড়ায়। আদালতের রায় কার্যকর করার দাবি থাকলেও সেই দাবি আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচিত হলেও মেয়রের পদে বসার জন্য নাগরিকদের জরুরি সেবা ব্যাহত করে চাপ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল রাজনীতির দৃষ্টান্ত হতে পারে না। ইশরাক সেটা করে খুব সমালোচিত হয়েছিলেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও ইশরাকের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। জুলাই নিয়ে করা তথ্যচিত্রে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি—এমন অভিযোগ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা আপত্তি জানিয়েছিলেন। সেই মতপার্থক্যের জবাবে ইশরাক দায়িত্বহীন ভাষায় কথা বলেন। শহীদদের জন্য কে কী করেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে উত্তেজনা বাড়িয়েছিলেন। মতবিরোধের জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়ার বদলে প্রতিপক্ষের অবদানকে খাটো করার প্রবণতা দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নয়।

ইশরাকের পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার ঘটনা থেকে এ ধরনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অবস্থান সম্পর্কে একটি বার্তা পাওয়া যায়। মিরপুরের রাড্ডা বারনেনের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সাম্প্রতিক পদত্যাগের কথাও ইশরাকের ঘটনা কেন্দ্র করে সামনে এসেছে। এসব ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ মাত্রা ছাড়ালে বা বড় বিতর্ক তৈরি হলে শীর্ষ নেতৃত্ব চরম ব্যবস্থা নিতে পারে। এটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে আরেকটি দিক আছে। দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আর প্রচলিত আইনের কাছে জবাবদিহি এক নয়। পদত্যাগের মাধ্যমে কেউ সরকারি বা দলীয় পদ হারাতে পারেন। কিন্তু তাতে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় আইন ভাঙা হয়েছে কি না এবং সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয় না। আইনের শাসনের অর্থ ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য একই আইনি মানদণ্ড নিশ্চিত করা। সব মিলিয়ে ইশরাক হোসেনের গেন্ডারিয়ার কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রকট প্রদর্শন ও রাজনৈতিক অপরিপক্বতার জ্বলজ্বলে উদাহরণ। জনগণ ভোটে নির্বাচিত করে কাউকে কোনো অনিয়ন্ত্রিত বিশেষ অধিকার দেয় না। নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব তখন বরং আরও বেড়ে যায়। পদমর্যাদা যত উঁচু, আচরণের দায়ও তত বেশি হয়। সেটা ভুলে গেলে চলে না।

ইশরাক হোসেন সংসদ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে থাকবেন। প্রতিমন্ত্রীর পদ হারানো তো রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়। কিন্তু এই ঘটনা তাঁর এবং ক্ষমতাসীন দলের অন্য নেতা-কর্মীদের জন্য আত্মবীক্ষণের সুযোগ তৈরি করেছে। রাজনীতিতে ক্ষমতা পাওয়া সাফল্য হতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতা সংযম ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করতে না পারলে তা দ্রুত দায়ে পরিণত হয়।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আজকের পত্রিকা

দুই বাংলাদেশি নাকি কূটনৈতিক সম্পর্কের শিরশ্ছেদ

সাগরের শীর্ষে বসে ঘুরপথে বাণিজ্য

উপনিবেশের কবজায় লোকজ ও দেশীয় সংস্কৃতি

দক্ষিণ চীন সমুদ্রে আধিপত্যের লড়াই

সম্প্রীতি ও আত্মপরিচয়ের মেলবন্ধন

অর্থনীতির অসুখ সারানো জরুরি

প্রাগৈতিহাসিক আয়নায় আধুনিকতা

দুটি মৃত্যু: শোক কার, দায় কার

যন্ত্রের শক্তিতে কৃষির রূপান্তর

গোলান মালভূমিসহ যেকোনো ভূখণ্ডের জবরদখলই দস্যুতা