হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আবুল হাসনাত স্মরণে কয়েকটি কথা

সৌভিক রেজা

আবুল হাসনাতের জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে বিংশ শতাব্দীতে। ছবি সৌজন্য: কালি ও কলম

কবি-অধ্যাপক-প্রাবন্ধিক নরেশ গুহকে লেখা এক চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকতা সাহিত্যের শত্রু। সাবধান!’ এই চিঠি যখন লিখছেন বুদ্ধদেব, তখন স্টেটসম্যান পত্রিকায় নিয়মিত সম্পাদকীয় লেখার কাজটি তিনি ছেড়ে দেবার কথা গভীরভাবেই চিন্তা করছেন এবং ছেড়েও দিয়েছিলেন কিছুদিনের মধ্যে। সাহিত্যের প্রতি তীব্র এক ভালোবাসা থেকেই তাঁকে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। অবশ্য এটিও ঠিক যে আমাদের মতো দেশগুলোতে বারবার পেশা বদলের সক্ষমতা সব লেখকের থাকে না। নানা কারণেই এখানে সে সুযোগ খুবই সীমিত। সেই সীমিত পরিসরের কথা যখন ভাবি, তখনই আবুল হাসনাতের কথা মনে না করে পারা যায় না। সেই কথাগুলোই এখানে বলার চেষ্টা করা হবে।

একজন সম্পাদক হিসেবে আবুল হাসনাতের কৃতিত্বের কথা নতুন করে কিছু না বললেও হয়তো চলবে। তিনি ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ‘সংবাদে’র সাহিত্য সাময়িকীর পাতার সম্পাদনার দায়িত্ব একটানা দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে পালন করেছিলেন। এর পরে যুক্ত হন সাহিত্য পত্রিকা ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদনায়; একই সঙ্গে চিত্রকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘শিল্প ও শিল্পী’র সম্পাদকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছিলেন। তারও আগে তিনি সম্পাদনা করেছিলেন ‘গণসাহিত্য’-এর মতো মাসিক সাহিত্য পত্রিকা। খ্যাতনামা কবি-প্রাবন্ধিক প্রয়াত আবদুল মান্নান সৈয়দ ১৯৯৪ সালে তাঁর এক গ্রন্থের ভূমিকায় আবুল হাসনাতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘আমার সমালোচনামূলক ও সমালোচনাব্যতিরেকে অনেক লেখা তাঁরই তাগিদে রচিত—আনন্দ ও গর্বের সঙ্গে একথা আজ আমি বলতে চাই। কবি ও লেখক হিসেবে তাঁর একটি পরিচিতি আছে; কিন্তু আমি মনে করি, সম্পাদক হিসেবেই তিনি শ্রেষ্ঠ; আমি মনে করি, সম্পাদক হিসেবে তিনি সিকান্দার আবু জাফর, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গনি হাজারী, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রমুখের গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার বহন করছেন। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে আমার ঋণ অনিঃশেষ—কেননা তাঁর ধৈর্যশীল ও নিরন্ত চাপে ও তাগিদে অলস ও অস্থির আমাকে অনেক লেখা লিখতে হয়েছে।’

সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি ‘মাহমুদ আল জামান’ নামে গল্প-কবিতা-উপন্যাস-প্রবন্ধ নিয়মিত লিখেছেন। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়ছে যে ‘ষাটের দশক থেকে কাব্যচর্চার সূত্রপাত। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ ষাটের দশকের প্রতিবাদ ও সংগ্রামমুখর জীবনের প্রতিচ্ছবি যেমন তাঁর কাব্যবিশ্বাসে জায়গা নিয়েছে, তেমনি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিজনিত আনন্দ-বেদনা, অস্থিরতা, নৈরাশ্য ও সংকটময় মুহূর্তগুলোও তাঁর বোধে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। সব কিছুর অন্তরালে রোমান্টিক কাব্যধারারও প্রবল স্রোত তাঁর চেতনায় নীরবে বয়ে গেছে।’ আমরা বলতে পারি যে, জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক, কোনো একদিন ভুবনডাঙায় কিংবা ভুবনডাঙার মেঘ ও নধর কালো বেড়াল কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর আমেজ সময়ের নির্ভরতা অতিক্রম করে পাঠকের মনে অনুরণিত হবে আরও দীর্ঘদিন।

২০১৭ সালে তাঁর এক নিবিড় ‘আত্মকথনে’ আবুল হাসনাত বলেছিলেন, ‘কবিতা লিখছি ষাটের দশক থেকে। কেন লিখি এ কখনও ভেবে দেখিনি। হৃদয়, মন, মস্তিষ্ক কখনো-সখনো দিন যাপনের দুঃখ, বেদনা, কষ্ট, গ্লানি, আনন্দ কবিতা লিখতে প্রেরণা দেয়। কখনও অঙ্গীকারের তাগিদে, কখনও ভাবাবেগে তাড়িত হয়ে। কখনও সুদূর অতীতে দেখা কোনো এক হেমন্ত শীত সকালের কথা ভেবে। স্মৃতি কখনও মিছিলে উত্তোলিত কোনো নারীর রণক্লান্ত হাত বড়ই উদ্বেল করে।’

তাঁর সতীনাথ, মানিক, রবিশঙ্কর ও অন্যান্য; জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দীন ও অন্যান্য প্রবন্ধগ্রন্থ আমাদের সাহিত্যের উর্বর সঞ্চয়। শিশু ও কিশোরদের জন্য তিনি রচনা করেছিলেন ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়, টুকু ও সমুদ্রের গল্প, যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুরে, রানুর দুঃখ-ভালোবাসা; এ ছাড়া লিখেছেন জসীমউদ্‌দীন, সূর্য সেনের কিশোর-জীবনী। কিন্তু শুরুতেই যে কথাটি বলা হয়েছে, সেটি আবুল হাসনাতের বেলায়ও ঘটেছে। পত্রপত্রিকায় সম্পাদনার চাকরি তাঁর সাহিত্যনিষ্ঠাকে নানাভাবেই গ্রাস করে ফেলেছিল। আবুল হাসনাত নিজেও এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন, অন্তত তাঁর স্মৃতিকথায় সেসবের সাক্ষ্য রয়েছে।

‘স্মৃতিকথা’ একজন মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের দিনলিপি না হলেও একে বলা যায়—সমগ্র জীবনের এক স্মৃতিময় দিনলিপি। তারপরেও কোনো ব্যক্তির স্মৃতিকথার ব্যাপারটি যখন আমরা ভাবি, তখন রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলো মনে না করে পারা যায় না। কী বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ? বলেছিলেন, ‘স্মৃতির পটে জীবনের ছবি কে আঁকিয়া যায় জানি না। কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ, যাহা-কিছু ঘটিতেছে তাহার অবিকল নকল রাখিবার জন্য সে তুলি হাতে বসিয়া নাই। সে আপনার অভিরুচি-অনুসারে কত কী বাদ দেয়, কত কী রাখে।’ আবুল হাসনাতের স্মৃতিকথা ‘হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে’ বইটি পড়তে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সেই পুরোনো কথাগুলোকেই আমরা নতুন করে উপলব্ধি করি। ‘জীবনের স্মৃতি জীবনের ইতিহাস নহে’—এই জ্ঞানটুকুও তো আমরা তাঁরই কাছ থেকে আত্মস্থ করেছি।

এই স্মৃতিকথার মধ্যে একজন সাধারণ মানুষকেই আমরা বারবার খুঁজে পেয়েছি। যে মানুষটি একেবারেই কোনো বীর নন, তেমন কোনো চমক লাগানো বিপ্লবী নন, নন্দিত জননেতা নন; বরং আমাদের এই সমাজের আরও দু-দশটা লোকের মতোই একজন গৃহস্থ মানুষ। ‘বিংশ শতাব্দীর সমানবয়সী’ কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মনে করতেন যে ‘অবৈকল্য আর অকপটতা’ ছিল ‘বিংশ শতাব্দীর মূল মন্ত্র’। আবুল হাসনাত সেই বিংশ শতাব্দীরই সন্তান। তাঁর জীবনের (জন্ম ১৯৪৩) একটি বড় অংশ কেটেছে ওই শতাব্দীতে। এই স্মৃতিকথায় সে কারণেই সম্ভবত নিজের সম্পর্কে এমন অকপট স্বীকারোক্তি দেখতে পাই। নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছেন: ‘ছেলেবেলায় কোনো বিষয়েই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না। না স্কুলের পড়াশোনায়, না বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলায়। আমার জীবন সেজন্য হয়ে উঠতে পারত জটিল, নিঃসঙ্গ, নির্বিকার ও ঘূর্ণির আবর্তে ভাব-উচ্ছ্বাসহীন।’ এর নেপথ্যের কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন অভিভাবকদের ‘অতিরিক্ত শাসন’ আর ‘দারিদ্র্যের কশাঘাত’কে। এ শুধু আবুল হাসনাতের একার কাহিনি নয়, বরং সেকালের প্রতিটি মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত সংসারের শিশু-কিশোরের এক সকরুণ ললাটের লিখন।

২০২০ সালের ১ নভেম্বর আবুল হাসনাত প্রয়াত হন। তাঁর স্মৃতির প্রতি

শ্রদ্ধা জানাই।

দুই বাংলাতেই অদ্ভুত সমন্বয়ী রাজনীতি আছে

সংগ্রামী নারী: উপন্যাস এবং বাস্তবের আলোয়

গণমাধ্যম ও নাগরিক সচেতনতা

অপরিকল্পিত নগরায়ণের কবলে দেশ

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্বেষের রাজনীতি কেন

বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকার, করণীয় কী

জীবনযাত্রার ব্যয়ে নাভিশ্বাস, উত্তাল ইউরোপ

উদীচীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: সংগ্রাম শুরু মুক্তির

কলেজ সরকারীকরণের দুঃসহ পরিণাম

মর্গে নারীদেহের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা