ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল চালুর অপেক্ষা বাড়ছে। সরকার ডিসেম্বরকে লক্ষ্য ধরে এগোলেও পরিচালনা চুক্তি সম্পাদন ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে টার্মিনালটি চালু হতে আরও অন্তত এক বছর লাগবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এদিকে টার্মিনাল চালু হওয়ার আগেই আগামী জুন থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করতে হচ্ছে। বছরে এই কিস্তির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তির শর্ত নিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় এখনো চুক্তি হয়নি। টার্মিনালটি চালু হলে যাত্রীসেবা, কার্গো হ্যান্ডলিংসহ বিভিন্ন খাতে যে বিপুল আয় হবে, তা বণ্টন নিয়েই মূলত মতপার্থক্য। দুপক্ষই আয়ের বড় অংশ রাখতে চায়। ৯ দফা আলোচনাতেও এ বিষয়ে সমঝোতা হয়নি; বিশেষ করে যাত্রী প্রস্থান ফি, আগাম অর্থ প্রদান এবং রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে সমঝোতা হয়নি। জাপানি কনসোর্টিয়াম আয়ের ২৫ শতাংশ বেবিচককে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বেবিচক আরও বেশি চায়। এসব বিষয়ে সমঝোতা হলে চুক্তি স্বাক্ষরের পথ খুলবে। চুক্তি স্বাক্ষরে অন্তত ৩ মাস লাগবে। এরপর শুরু হবে ‘অপারেশন রেডিনেস অ্যান্ড এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার’ (ওরাট) কার্যক্রম, যা ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত চলতে পারে।
তৃতীয় টার্মিনালের অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করবে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, সোজিৎস ও নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করপোরেশন। নিরাপত্তা তদারক করবে বেবিচক। টার্মিনালে চার হাজার নিরাপত্তাকর্মীসহ প্রায় ছয় হাজার জন কাজ করবেন।
জানতে চাইলে বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারনির্ধারিত সময়সীমা সামনে রেখে কাজ এগিয়ে চলছে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় দ্রুত শিফটিং ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সতর্কতার সঙ্গে ধাপে ধাপে কার্যক্রম এগোনো হচ্ছে। তিনি বলেন, জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালনা চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া চলছে। এ পর্যন্ত নয়বার তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই চুক্তি করা হবে। আলোচনায় কিছু বিষয়ে দুপক্ষ একমত হলেও কিছু বিষয়ে গ্যাপ রয়ে গেছে। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। এরপর শুরু হবে ওরাট কার্যক্রম, যা ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত চলতে পারে। এই প্রক্রিয়া শেষে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হলে টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হবে।
তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার ঋণ চুক্তি হয়েছে। এরপর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বেবিচকের ‘ঋণ সমন্বয়’বিষয়ক একটি চুক্তি হয়েছে। ঋণের কিস্তি পরিশোধ আরও দেড় বছর আগে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সরকারের কাছ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে নেয় বেবিচক। বছরে এই কিস্তির পরিমাণ ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
বেবিচকের চেয়ারম্যান জানান, প্রথম কিস্তি আগামী জুনে শুরু হবে। ২০৫৬ সাল পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধ করতে হবে।
২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। বাকি অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই টার্মিনালে রয়েছে ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার, ৬৬টি ডিপারচার ইমিগ্রেশন ডেস্ক, ৫৯টি অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন ডেস্ক ও ৩টি ভিআইপি ডেস্ক। টার্মিনালটি চালু হলে যাত্রী ধারণক্ষমতা বছরে ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ৪০ লাখে উন্নীত হবে। কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে বছরে ১০ লাখ টনে দাঁড়াবে।
তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাশাপাশি একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বেবিচক।
বেবিচকের চেয়ারম্যান বলেন, তৃতীয় টার্মিনালে সেবার মানোন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে যাত্রীসেবা আরও আধুনিক ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।