চব্বিশের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দীর্ঘ একটা সময় দেশে পুলিশ বাহিনী বলতে মাঠে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে চলছিল ‘মবের রাজত্ব’। সেই পরিস্থিতি থেকে কাজে ফিরিয়ে এনে পুলিশ বাহিনীর মনোবল পুনরুদ্ধার করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এতে বিশেষ কোনো ফল হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার মতলবে সুযোগসন্ধানীরা ইচ্ছাকৃতভাবে পুলিশকে দুর্বল রাখতে চাইছে।
শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত আন্দোলনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কেটেছে দুই বছরের কিছু বেশি সময়। এ পুরোটা সময় ধরে নানা ধরনের সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংস বিক্ষোভ মোকাবিলা, থানায় ক্ষুব্ধ জনতার হামলা, সহিংসতায় ৪৬ সহকর্মীর মৃত্যু এবং পরে মামলার চাপ— সব মিলিয়ে মাঠপর্যায়ের অনেক সদস্য মানসিক চাপে ভুগছেন। চাকরিসহ নানা বিষয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তাঁরা। এত দিন পরও সেই মানসিক পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি পুলিশ বাহিনী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুযোগসন্ধানী চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে পুলিশকে দুর্বল রাখতে চায়, যাতে আইনশৃঙ্খলার অবনতির সুযোগ নিয়ে তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পারে।
সরকার ও পুলিশ সদর দপ্তর পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধারে নানা উদ্যোগের কথা বললেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। আসামি গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশের হামলার শিকার হওয়া, থানায় হামলা হওয়া, ট্রাফিক পুলিশের লাঞ্ছিত হওয়া কিংবা দায়িত্ব পালনকালে বাধার মুখে পড়ার ঘটনা এখনো প্রায়ই ঘটছে। ফলে বাহিনীর ভেতরে আত্মবিশ্বাসের সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
গত ২৯ জুলাই কুমিল্লার বরুড়ায় ধর্ষণ মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা হামলার শিকার হন। অভিযুক্তকে ছাড়িয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়। ৯ জুলাই বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় মাদক কারবারি রিয়াজের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে দিয়ে একদল দুর্বৃত্ত থানায় হামলা চালায়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটলেও এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। দেশকে অস্থিতিশীল রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর লক্ষ্যেই কোনো চক্র পরিকল্পিতভাবে পুলিশকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, ‘পুলিশকে অস্থিতিশীল রাখতে দুটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। একটি গ্রুপ পুলিশের ভেতরে থেকেই বিভেদ সৃষ্টি ও উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং এখনো চাকরিতে বহাল আছেন এমন একদল আছেন। এ ছাড়া আছে পলাতক ও দুষ্কৃতকারীদের একটি গ্রুপ, যারা গুজব ছড়িয়ে পুলিশকে অস্থির করে তুলতে চায়। অস্থিতিশীল পরিবেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পাওয়াই তাদের লক্ষ্য।’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬০০টি ঘটনায় পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে। ২০২৫ সালেও হামলার ঘটনা ছিল ৬০১টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩১৭টি হামলা হয়েছে। আন্দোলনের সময়ের বাইরে পুলিশের ওপর হামলা ও দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটেছে আসামি গ্রেপ্তার এবং অপরাধবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে। পেশাদার অপরাধী ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনতা, রাজনৈতিক কর্মী, আসামির স্বজন কিংবা সংঘবদ্ধ দলও এসব হামলায় জড়িত থাকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে আগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অনেকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। ফলে চাকরির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বাহিনীর ভেতরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তত ১০টি প্রধান কারণে পুলিশের মনোবল এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। এর মধ্যে রয়েছে সংকটের সময়ে নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক চাপ, দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তা, মামলা ও জবাবদিহির ভয়, জন-আস্থার ঘাটতি, পর্যাপ্ত কল্যাণ ও মানসিক সহায়তার অভাব, ঘন ঘন বদলি ও দুর্বল নেতৃত্ব, অপারেশনাল অভিজ্ঞতাহীন কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আসা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও সীমিত সুযোগ-সুবিধা, পুলিশ হত্যা মামলার বিচার না হওয়া এবং আবারও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা।
এত দিন পরও পুলিশের মনোবল পুরো ফিরে না আসার বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘শুধু নির্দেশনা দিয়ে এটা সম্ভব হবে না। এর জন্য প্রয়োজন পেশাদার নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মপরিবেশ, সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠন।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের গবেষক সি এ আল-হোসাইনী, এম এম কামাল ও এস ইয়াসমিনের যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় প্রতিটি শাসনামলেই পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অনুগত কর্মকর্তারা পুরস্কৃত হওয়ার পাশাপাশি ভিন্নমতাবলম্বীরা বিভিন্নভাবে তিরস্কৃত হয়েছেন। বাহিনীর পেশাদারত্ব ও মনোবলে এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গবেষণায় স্বাধীন ও সেবাধর্মী বাহিনী গঠনের জন্য পুলিশ আইন সংস্কার, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন ও রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাসহ নয়টি নীতিগত সুপারিশ করা হয়েছে।