ভালোবাসার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য কোনটি বেশি প্রয়োজন—শরীর না মন? মানুষ ‘আগে দর্শনদারি, পরে গুণবিচারি’। আবার রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে যদি দিন শুরু হয়, তাহলে আপনিও জানেন, হৃদয়স্পর্শী ভালোবাসার ঊর্ধ্বে আর কিছু নেই। সেখানেও ভালোবাসার মানুষকে একটু ছুঁয়ে দেখার আকুতি থাকে। বলতে চাইছি, প্রেমের সম্পর্কে শারীরিক ও মানসিক ঘনিষ্ঠতা—দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কথায় ভুল বোঝার অবকাশ থাকলে একটু খোলাসা করেই নাহয় বলি, শারীরিক ঘনিষ্ঠতা মানেই যৌনতা নয়। এটা ভীষণ কান্না পেলে বুকে জড়িয়ে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে শাড়ির কুঁচি ঠিক করে দেওয়া কিংবা বৃষ্টিতে হাত ধরে ভেজাও হতে পারে। এ ধরনের শারীরিক চাহিদা ঠিকমতো পূরণ না হলে অনেক সময় তৃতীয় পক্ষ প্রবেশ করতে পারে সম্পর্কে। শারীরিক ও মানসিক সম্পর্ক যুগলের বয়স ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্য দিয়ে প্রভাবিত। এর পক্ষে এবং বিপক্ষের যুক্তিগুলো মনস্তাত্ত্বিক ও নিউরোসায়েন্সের ভিত্তিতে একটু ভেঙে বলি।
ঘনিষ্ঠতাকে দুই ভাগে করা যেতে পারে।
নারী-পুরুষভেদে ঘনিষ্ঠতার আকাঙ্ক্ষা ভিন্ন
পুরুষের ক্ষেত্রে সম্পর্কের শুরু থেকে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা আকাঙ্ক্ষিত। এক হাত ধরে বসা, রাস্তা পার হওয়ার সময় সঙ্গীর কাঁধে হাত রাখা, চুলে ফুল গুঁজে দেওয়া, সাইকেলে সঙ্গীকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি আকাঙ্ক্ষা শুরু থেকেই তাদের মধ্যে কাজ করে। তবে গভীরতা কম হলে, সম্পর্ক ভালো না গেলে, সম্পর্কের গভীরতা চলে গেলে, মানসিক চাপে ভুগলে শারীরিক ও মানসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নষ্ট হয়ে যায়। নারীরা এ ক্ষেত্রে একটু ধীরগতিতে এগোতে চান। তবে মানসিকভাবে তৃপ্ত না হলে চট করে শরীরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না নারীরা। অর্থাৎ মনের দুয়ার পেরিয়ে তাঁরা দেহের দুয়ারে প্রবেশ করেন।
পুরুষেরা শারীরবৃত্তীয়ভাবে যতটুকু সক্রিয়, মেয়েদের মানসিক ভালো লাগা তৈরি না হলে শরীর ততটা ঠিক কাজ করে না। তাই প্রেমের সম্পর্কে শরীরের জন্য মন যেমন দরকার, তেমনি মনের জন্য শরীরও। এটা কমবেশি হতেই পারে।
কেন দুটোই জরুরি
মনুষ্য সমাজে ‘লাভ মেকিং’ নামে একটি শব্দ
প্রচলিত আছে। যেখানে ভালোবাসা, স্পর্শ এবং আত্মিক যোগাযোগ, মমতা মাখামাখি হয়ে যায় একই পাত্রে। এটা পশুসমাজে নেই। প্রিয় মানুষের স্পর্শ হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়। সেটা কোনো শিশুকে জড়িয়ে ধরলেও হয়। অক্সিটোসিন আন্তসম্পর্কে বন্ডিং বাড়ায়, মনোদৈহিক চাপ কমায়। ২০২১ সালে প্রকাশ পাওয়া এক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাকালীন লকডাউনের সময় যাঁরা সঙ্গীর কাছাকাছি ছিলেন, তাঁদের দুশ্চিন্তা এবং বিষণ্নতার হার কম ছিল।
রাঙিয়ে দিয়ে যাও
আবেগময় ও শারীরিক—দুই ধরনের ঘনিষ্ঠতা যেমন জরুরি, পাশাপাশি এটাও বোঝা দরকার, আকাঙ্ক্ষাটি কি স্বাভাবিকতার পর্যায়ে পড়ে, নাকি বিকৃতি কিংবা পারভারসন? এমন কোনো আচরণ কি আপনি চাচ্ছেন, যেটা পূরণ করা সঙ্গীর জন্য অস্বস্তিকর হয়ে যাচ্ছে? এতে করে খুব স্বাভাবিকভাবে মনোদৈহিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। এর কারণে দুজনকেই ভুগতে হবে। প্রেম থাকাকালীন সুসম্পর্ক রাখার জন্য সঙ্গীর পারস্পরিক সংবেদনশীলতা প্রয়োজন। সেদিকে মনোযোগ দেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। দুটি মানুষের মধ্যে দাম্পত্য-বন্ধন শুধু শারীরিক ঘনিষ্ঠতা দিয়েই পরিমাপ করা যায় না। কারণ, শুধু শারীরিক ঘনিষ্ঠতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হতে পারে। অপর দিকে বিশ্বাস, সামঞ্জস্য এবং মানসিক সাদৃশ্যের মতো উপাদানগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। তবে এটি তখনই সম্ভব, যখন অন্যান্য ঘনিষ্ঠতাও বিদ্যমান থাকে। প্রেমের সম্পর্ক একটি চারাগাছের মতো, যাকে প্রতিদিন যত্ন করতে হয়। কীভাবে এই যত্ন করবেন? তবে শারীরিক-মানসিক ঘনিষ্ঠতার বাইরে আরও কিছু ঘনিষ্ঠতার চর্চা করা প্রয়োজন। চলুন, জানি কী সেগুলো—
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি