হোম > জীবনধারা > ফ্যাশন

গবলিন ফ্যাশন তারুণ্যের ছকভাঙা সাজ

ফারিয়া রহমান খান 

মডেল: মার্শিয়া। টপস: আর্টেমিস,ট্রাউজার: হরিতকী। ছবি: হাসান রাজা

কোনো তরুণীর দুই পায়ে দুই ধরনের স্ট্রাইপড মোজা চোখে পড়লে, নখে নীল ও সবুজ নেইলপলিশ, এক কানে দুল, নাকে বড় নথ, চোখে একটুখানি থেবড়ানো কাজল কিংবা চুলটা না খোঁপা না পনিটেইল করে বাঁধা দেখলে, ঠিক কী মনে হবে আপনার? মনে হবে, ভুলে দুই পায়ে দুই মোজা পরেছে বা ঘুম থেকে উঠে চুল না আঁচড়েই বেরিয়ে পড়েছে—তাই তো? কিন্তু ঘটনা একেবারেই উল্টো। আপনি যখন ভাবছেন, এ যুগের ‘এরা কী রে!’, তখন হয়তো আপনার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে বৈচিত্র্যপিয়াসি তারুণ্য মেতেছে ফ্যাশনের এক নতুন চর্চায়। মানে, আপনার ভাবনার বাইরে তরুণদের ফ্যাশনে নীরবে জায়গা করে নিয়েছে এক নতুন ট্রেন্ড—আপনি যা টেরও পাননি।

ফ্যাশন দুনিয়ায় ট্রেন্ড বদলায় খুব দ্রুত। তবে গতানুগতিক নিখুঁত আর পরিপাটি সাজের ভিড়ে এবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে খানিকটা অগোছালো, অদ্ভুত এবং প্রকৃতিঘেঁষা এক নতুন ধারা—গবলিন ফ্যাশন। জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে আসা এই ফ্যাশন মূলত কৃত্রিম সাজগোজের প্রথা ভেঙে নিজের স্বাতন্ত্র্য, মানসিক স্বাধীনতা আর আরামকেই উদ্‌যাপন করে।

কটেজকোর বা গ্রামীণ স্নিগ্ধ ফ্যাশনের এক রূপ বলা চলে এটিকে। যেখানে প্রচলিত ফ্যাশনে নিখুঁত ফিটিং ও ইস্তিরি করা পোশাকের কদর করা হয়, সেখানে গবলিন ফ্যাশনে প্রাধান্য পায় মাটির কাছাকাছি শেড, ভিনটেজ কাপড়ের লেয়ারিং এবং সচেতনভাবে বেছে নেওয়া অগোছালো ভাব।

মডেল: মার্শিয়া। টপস: আর্টেমিস,ট্রাউজার: হরিতকী। ছবি: হাসান রাজা

গবলিন ফ্যাশন কী

গবলিন ফ্যাশন হলো, গতানুগতিক পরিপাটি সাজগোজের বিপরীতে তরুণ প্রজন্মের এক ছকভাঙা, অগোছালো ও আরামদায়ক ফ্যাশন ট্রেন্ড। কৃত্রিম রূপচর্চা ও নিখুঁত ফিটিংয়ের বদলে এতে ওভারসাইজড ভিনটেজ পোশাক, নানান শেড এবং অমিল অ্যাকসেসরিজ প্রাধান্য পায়। সব পোশাক মিলিয়ে এমনভাবে পরা হয়, যেন দেখতে মনে হয় কোনো গহিন সবুজ বনের বাসিন্দার ছকভাঙা এক রূপ সামনে হাজির। এই স্টাইলের মূলকথাই হলো ইমপারফেকশন বা নিখুঁত না হওয়ার সৌন্দর্য গ্রহণ করা।

মডেল: মার্শিয়া। টপস: আর্টেমিস,ট্রাউজার: হরিতকী। ছবি: হাসান রাজা

গবলিন ফ্যাশনের মূলমন্ত্র

এই ফ্যাশনে কোনো বাঁধাধরা নিয়ম বা ফ্যাশন পুলিশ নেই। আর এটিই এর আসল সৌন্দর্য। পোশাকটি যদি ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক হয়, গায়ে জড়িয়ে একটু বুনো বা জঙ্গল ভাইব আনে, তবেই বুঝবেন আপনার গবলিন ফ্যাশন পারফেক্ট হয়েছে। তবে ফ্যাশন-সচেতনেরা আবার বুঝে-শুনে স্টাইলিং করতেও পারদর্শী আজকাল।

মডেল: মার্শিয়া। টপস: আর্টেমিস,ট্রাউজার: হরিতকী। ছবি: হাসান রাজা

স্টাইলিংয়ের জনপ্রিয় রূপ

পশ্চিমা দেশগুলোয় সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত শরৎকাল চলে। এই সময়টাতেই হ্যালোইন উৎসবের আয়োজন ও উদ্‌যাপন করা হয়। ফলে পশ্চিমে অদ্ভুত সব পোশাক কেনাকাটা, তৈরি ও পরার মোক্ষম সময় এই শরৎ। গবলিন ফ্যাশনের চর্চা এই মৌসুমেই বাড়ে বৈকি! ফ্যাশন বিশ্বে ট্রেন্ড খুব দ্রুতই সীমানা ছাড়ায়। ফলে আমাদের এই অঞ্চলের তরুণেরাও গবলিন ফ্যাশনকে সাদরে গ্রহণ করেছেন। বিশ্বে গবলিন ফ্যাশনের বিভিন্ন জনপ্রিয় লুক রয়েছে। যেমন—

গয়না ও অ্যাকসেসরিজ

  • একাধিক স্তরের মেটাল বা অ্যান্টিক রুপালি আংটি ও ছোট লকেট
  • পুরোনো চামড়ার স্যাচেল বা ভিনটেজ সাইড ব্যাগ
  • ওড়নার মতো করে মাথায় বা গলায় জড়ানো রঙের বৈচিত্র্য থাকা ক্রোশে স্কার্ফ
  • দুটি দুই ধরনের অমিল বা ম্যাচ না করা কানের দুল

ডার্ক কটেজ কোর গবলিন

ঢিলেঢালা ভিনটেজ কোনো লিনেন বা সুতির লং ড্রেসের ওপর একটি ক্রপড নিটেড কার্ডিগান জড়িয়ে নিলে তৈরি হয় জঙ্গলপ্রেমী ভাইব। সঙ্গে পাটের বোনা ঝোলা ব্যাগ আর নরম মাটি রঙের শেড বেছে নিলে পুরো লুকে চলে আসে একধরনের ড্রিমি ও নস্টালজিক ভাব।

মিডনাইট মার্কেট গবলিন

এটি একটু ডার্ক ও ড্রামাটিক স্টাইল। ডার্ক শেডের প্যাচওয়ার্ক স্কার্ট, ওভারসাইজড গ্রাফিক টি-শার্ট এবং ওপরে একটি লম্বা ঢিলেঢালা ওভারকোট। সঙ্গে হাতে একাধিক মোটা রুপালি আংটি পরলে রাতের আমেজ আর রহস্যময়তার একটা দারুণ ভারসাম্য তৈরি হয়।

মডেল: মার্শিয়া। টপস: আর্টেমিস,ট্রাউজার: হরিতকী। ছবি: হাসান রাজা

একাডেমিক গবলিন

এটি মূলত ডার্ক একাডেমিক ফ্যাশন ও পুরোনো কাপড়ের মিশ্রণ। পুরোনো দিনের কিছুটা খসখসে কর্ডুরয় প্যান্ট, ঢিলেঢালা ভিনটেজ ব্লেজার আর গোল তারের ফ্রেমের চশমা পরুয়া কিন্তু খামখেয়ালি এক চরিত্র ফুটিয়ে তোলে, যা দেখতে বেশ স্মার্ট লাগে।

মাশরুম গবলিন

খয়েরি রঙের বার্ড-লেগ বা ওয়াইড-লেগ ট্রাউজারের সঙ্গে একটি ক্রিম রঙের পেজেন্ট ব্লাউজ পরলে তৈরি হয় সফট গবলিন লুক। সঙ্গে যদি একটা মাশরুম প্রিন্টের ক্যানভাস টোট ব্যাগ ঝুলিয়ে নেওয়া যায়, তবে সেটি বেশ চঞ্চল, উষ্ণ ও কিউট দেখায়।

জনপ্রিয়তার কারণ

আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ফিল্টার করা কৃত্রিম রূপের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে মানুষ যখন ক্লান্ত, ঠিক তখনই গবলিন ফ্যাশন স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে এসেছে। এটি তরুণদের দেখিয়ে দেয়, ফ্যাশনে নিখুঁত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। সেই সঙ্গে পুরোনো বা রিচক্রাফটেড কাপড়ের ব্যবহার বাড়িয়ে এটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রাকেও উৎসাহিত করে।

ফ্যাশন মানেই দামি ব্র্যান্ডের নিখুঁত পোশাক নয়; কৃত্রিমতার চেয়ে নিজের স্বাভাবিক রূপ ভালোবাসাই আসল ফ্যাশন। গবলিন ফ্যাশন মূলত সেই স্বাধীনতা ও নিজস্বতার গল্প বলে।