প্রতিদিনের কাজ ও চলাফেরার জন্য পরিমাণমতো পানি পান প্রয়োজনীয়। অনেকের জন্য রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস পানি পান শরীরে পানির ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে। আবার কারও কারও জন্য এটি রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার কারণ হতে পারে। আসলে রাতে ঘুমানোর আগে পানি পান স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। উপকারিতা তো আছেই, গবেষকেরা জানাচ্ছেন, রাতে ঘুমানোর আগে পানি পানে আছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও আর্দ্রতা রক্ষা: প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের ওজন এবং পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। রাতে ঘুমের মধ্যেও শ্বাসপ্রশ্বাস আর ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার কারণে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে। রাতে ঘুমানোর আগে পানি পান পানিশূন্যতা রোধ করে শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে দ্রুত ঘুমাতে সহায়ক।
মানসিক অবস্থার উন্নতি: পর্যাপ্ত পানি পানের অভ্যাস না থাকলে মানুষের মেজাজ বা মানসিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা সামগ্রিক ঘুম ও জাগরণের চক্র ব্যাহত করে। পানি পানের পরিমাণ বাড়ালে ইতিবাচক আবেগ, মানসিক সন্তুষ্টি এবং শান্ত ভাব বাড়ে।
প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতা ও বিষাক্ত পদার্থ বর্জন: ঘুমানোর আগে বিশেষ করে হালকা গরম বা কুসুম গরম পানি পান করলে তা শরীরের রক্তসঞ্চালন বাড়াতে এবং পরিপাক প্রক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করে। এটি ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে অতিরিক্ত লবণ ও বিষাক্ত উপাদান বের করে দেয় এবং পেটব্যথা উপশমে সাহায্য করে। সাধারণ পানি পানে একঘেয়েমি লাগলে বা সর্দি-কাশির সমস্যা থাকলে পানিতে সামান্য লেবু মিশিয়ে নেওয়া যায়। এর ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়।
ঠান্ডা ও অসুস্থতায় স্বস্তি: সর্দি বা ফ্লুতে আক্রান্ত হলে এক গ্লাস গরম পানি পানের অভ্যাস শারীরিক অস্বস্তি কমিয়ে আরামদায়ক ঘুমে সাহায্য করে। এ ছাড়া যাঁদের নাক বন্ধ থাকে, তাঁরা নাক দিয়ে শ্বাস নিতে না পেরে মুখ দিয়ে শ্বাস নেন। এ কারণে শরীর থেকে বেশি পানি বের হয়ে যায়, যা পূরণে ঘুমানোর আগে পানি পান জরুরি।
সুস্থতার জন্য সারা দিন হাইড্রেটেড থাকা প্রয়োজন হলেও ঘুমানোর ঠিক আগমুহূর্তে পানি পানের কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে। সেগুলো হলো—
স্বাভাবিক অবস্থায় রাতে ঘুমের সময় আমাদের শরীরে মূত্র উৎপাদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায়। এর ফলে মানুষ টানা ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুমাতে পারে। কিন্তু ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত পানি পানে এই প্রাকৃতিক চক্র ব্যাহত হয় এবং রাতে প্রস্রাবের বেগে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। রাতে একাধিকবার প্রস্রাবের জন্য জেগে ওঠার এই সমস্যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘নকটুরিয়া’ বলা হয়। এর কারণে নিয়মিত ঘুম ভাঙলে কর্মক্ষমতা হ্রাস, পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটা এবং মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বাড়ে।
ঘুমানোর আগে পানি পানের কারণে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে তা দীর্ঘ মেয়াদে ঘুমের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। রাতে ৬ ঘণ্টার কম ঘুমালে উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি এবং স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মূত্রাশয় বা ব্লাডার অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দেয়; বিশেষ করে যাঁরা ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ কিংবা প্রোস্টেটের সমস্যায় ভুগছেন। যাঁরা মূত্রবর্ধকজাতীয় ওষুধ খান, ঘুমানোর আগে পানি পান করলে তাঁদের নকটুরিয়ার সমস্যা আরও প্রকট হয়। এ ছাড়া স্মৃতিভ্রংশ বা স্ট্রোকের মতো জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের মস্তিষ্ক ব্লাডারের সংকেত সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। ফলে রাতের বেলা সমস্যা আরও বাড়ে।
রাতে বারবার জেগে ওঠা প্রতিরোধ করতে ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে থেকে পানি বা অন্য যেকোনো তরল পান করা থেকে বিরত থাকুন।
রাতে অতিরিক্ত পানি পানের প্রয়োজন যেন না হয়, সে জন্য সারা দিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পানিসমৃদ্ধ ফল ও সবজি রাখুন এবং প্রতি বেলা খাবারের সঙ্গে পানি পানের অভ্যাস করুন।
রাতের বেলা অতিরিক্ত লবণাক্ত, মিষ্টি কিংবা অতিরিক্ত ঝালযুক্ত খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলুন। এতে ঘুমানোর আগে তীব্র তৃষ্ণা পাবে না। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর অ্যালকোহল, চা বা কফি এবং চিনিযুক্ত পানীয় পান বাদ দিন।
আপনার শরীরে পানির ঘাটতি আছে কি না, তা বোঝার উপায় হলো প্রস্রাবের রং লক্ষ্য করা। রং হালকা হলুদ বা পরিষ্কার হলে শরীরে পানির পরিমাণ ঠিক আছে। কিন্তু গাঢ় হলুদ হলে বুঝতে হবে, শরীরে পানির ঘাটতি রয়েছে। রাতে ঘুমানোর আগে অবশ্যই একবার প্রস্রাব করে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস করুন।
যদি সন্ধ্যায় তরল পানের পরিমাণ কমানোর পরেও রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ হয়, তবে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, এটি স্লিপ অ্যাপনিয়াসহ অন্য কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে।
সূত্র: হেলথ লাইন, স্লিপ ফাউন্ডেশন