হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালি মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর এর রোগ মানবজীবনের সবচেয়ে বড় নীরব ঘাতকদের একটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি তিনটি মৃত্যুর মধ্যে প্রায় একটির পেছনে রয়েছে হৃদ্রোগ। তবে বিশ্বের সব দেশের চিত্র একরকম নয়। কিছু দেশ হৃদ্রোগের মৃত্যুকে আশ্চর্যজনকভাবে কমিয়ে আনতে পেরেছে। আবার কিছু দেশে এটি মৃত্যুর প্রধান কারণ। কোন দেশগুলোর মানুষের হৃৎপিণ্ড সবচেয়ে সুস্থ এবং তারা কোন জাদুমন্ত্রে এটি অর্জন করেছে, তার একটি চমৎকার তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউর প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে।
বিশ্বের দীর্ঘায়ু ও কম হৃদ্রোগের দেশের কথা বললে সবার আগে আসে জাপানের নাম। দেশটির ইস্কেমিক হৃদ্রোগে মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ৩০ জনের কাছাকাছি, যা ধনী দেশগুলোর গড়ের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক কম। মাছ ও শাকসবজিতে ভরপুর ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং দৈনন্দিন জীবনে হাঁটার অভ্যাসই জাপানিদের সুস্থ হৃদয়ের মূল চাবিকাঠি। অন্যদিকে ওসিডির তালিকায় সবচেয়ে নিচের দিকে অবস্থান করে দক্ষিণ কোরিয়া। সেখানে হৃদ্রোগে মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ২৫ জনের কাছাকাছি। যদিও হৃদ্রোগ দেশটিতে ক্যানসারের পর দ্বিতীয় প্রধান মৃত্যুর কারণ। তবু উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতালগুলোর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং শাকসবজি ও গাঁজানো খাবারে সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাস কোরিয়ানদের হৃৎপিণ্ড সুরক্ষিত রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো হৃদ্রোগ নিয়ন্ত্রণে বেশ এগিয়ে রয়েছে। ফ্রান্সে হৃদ্রোগে মৃত্যুর হার প্রতি লাখে প্রায় ৩৫, স্পেনে ৪০ এবং সুইজারল্যান্ডে ৫৫। ‘ফ্রেঞ্চ প্যারাডক্স’ হিসেবে পরিচিত ফরাসিদের খাদ্যাভ্যাস কিংবা স্পেনের জলপাই তেল, শাকসবজি ও মাছভিত্তিক বিখ্যাত ভূমধ্যসাগরের ডায়েট হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে দারুণ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড উচ্চ আয়ের পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে এই তালিকায় নিজেদের ওপরের দিকে রেখেছে।
এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে হৃদ্রোগ মৃত্যুর প্রধান কারণ। ২০২৩ সালে দেশটিতে প্রায় ৬ লাখ ৮১ হাজার লোক হৃদ্রোগে মারা গেছে, যা ক্যানসারের চেয়ে প্রায় ৬৮ হাজার বেশি। উন্নত চিকিৎসালয় থাকা সত্ত্বেও জীবনযাত্রার ভুল অভ্যাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই তালিকায় পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপের অন্য প্রান্তে, অর্থাৎ পূর্ব ইউরোপে চিত্রটি আরও ভয়াবহ। বাল্টিক দেশগুলোর মধ্যে লিথুয়ানিয়ায় হৃদ্রোগের হার প্রতি লাখে প্রায় ৩০০, যা জাপানের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে মন্থরগতির কারণে মূলত এই অঞ্চলে হৃদ্রোগের প্রকোপ বেশি।
ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের মতে, হৃদ্রোগজনিত অকালমৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য। অর্থাৎ সঠিক জীবনযাপন ও অভ্যাসের মাধ্যমে এই মৃত্যুর বড় একটি অংশ এড়ানো সম্ভব। সুস্থ হৃৎপিণ্ড শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে না। এটি গড়ে ওঠে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের ওপর।
হৃদ্রোগের এই বৈশ্বিক ব্যবধান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সুস্থ থাকা বড় কোনো অলৌকিক বিষয় নয়। এটি সঠিক খাদ্যাভ্যাস, সচেতনতা এবং সুস্থ জীবনধারার ফল। তাই হৃৎপিণ্ড সুস্থ ও সবল রাখতে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার: ওটস, বার্লি, শিম, আপেল ও নাশপাতির মতো দ্রবণীয় ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।
সুষম সকালের নাশতা: পুষ্টিকর ও ভারী নাশতা সারা দিনের শক্তি জোগায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। নাশতায় ওটমিল, গোটা শস্যের রুটি, ডিম কিংবা বাদাম রাখা যেতে পারে।
মাছ ও বাদাম খাওয়ার অভ্যাস: স্যামন, টুনা বা স্থানীয় ছোট মাছের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্রোগ প্রতিরোধে দারুণ উপকারী। এ ছাড়া কাঠবাদাম, আখরোটও হৃৎপিণ্ডের জন্য খুব ভালো।
লবণ ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট কমানো: খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও ফাস্ট ফুড খাওয়ার অভ্যাস উচ্চ রক্তচাপ বাড়ায়। চর্বিযুক্ত খাবারের বদলে জলপাই তেল বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
চা ও ডার্ক চকলেট: দিনে ১ থেকে ৩ কাপ সবুজ বা কালো চা এবং পরিমিত ডার্ক চকলেট খাওয়া হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, হেলথ লাইন