বেগুন সবজি নাকি ফল? হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনলে যে কেউ একটু হোঁচট খাবেন বটে। কিন্তু প্রশ্নটা তো করাই যায়—বেগুন সবজি নাকি ফল?
সবজি হিসেবে বেগুন খাওয়ার ব্যাপক প্রচলন আছে আমাদের দেশে। এর ভর্তা কিংবা বিভিন্ন সবজির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া অথবা মাছের সঙ্গে সুস্বাদু তরকারি আমাদের দেশে প্রচুর খাওয়া হয়। কিন্তু জেনে খানিক অবাক হবেন, সবজি হিসেবে পরিচয় থাকলেও এটি নাইটশেড পরিবারের একটি ফল। বেগুন ছাড়াও এই পরিবারে আমাদের পরিচিত ‘সবজি’গুলোর মধ্যে আছে আলু, টমেটো, ক্যাপসিকামসহ বিভিন্ন ধরনের মরিচ।
বেগুন নিয়ে আমরা প্রায়ই যে সমস্যার কথা বলি তা হলো, এটি খেলে অনেকের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চুলকানির সমস্যা শুরু হয়। চিকিৎসকেরা যাকে অ্যালার্জি বলেন। এটা সবার না হলেও একটি সাধারণ সমস্যা। এর সাধারণ ব্যাখ্যা হলো, শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম বেগুনের কিছু প্রোটিনকে ক্ষতিকর মনে করে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাই এটি হয়ে থাকে। এর কারণে সাধারণত হজমের সমস্যা, গ্যাস, পেটের অস্বস্তি বা শরীরে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। সঠিক পরীক্ষা ছাড়া শরীরে সাধারণ প্রদাহ আর অ্যালার্জি—এ দুটির পার্থক্য বোঝা কঠিন। সাধারণভাবে বেগুন খাওয়ার পর মুখ বা গলায় চুলকানি কিংবা অস্বস্তি হলে অনেকে একে এগপ্ল্যান্ট সিনড্রোম বলে থাকেন। এটি সাধারণত ওরাল অ্যালার্জি সিনড্রোম বা খাবারের সংবেদনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বেগুনে অ্যালার্জির লক্ষণ অন্যান্য খাবারের অ্যালার্জির মতোই হতে পারে। যেমন শরীরে চাকা চাকা ফুসকুড়ি বা হাইভস, ঠোঁট, জিহ্বা বা গলায় চুলকানি বা ঝিনঝিন অনুভূতি, কাশি, পেটব্যথা বা পেটে মোচড়, বমি বা ডায়রিয়া ইত্যাদি। সাধারণত বেগুন খাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই এসব লক্ষণ দেখা দেয়। তবে কখনো কখনো কয়েক ঘণ্টা পরেও লক্ষণ শুরু হতে পারে। বেগুনে হিস্টামিনের পরিমাণ খুব বেশি নয়। তবে এটি হিস্টামিন লিবারেট অর্থাৎ সংবেদনশীল ব্যক্তির শরীরে হিস্টামিন নিঃসরণ বাড়াতে পারে। অনেকের বেগুন খাওয়ার পর গলা বা জিহ্বা চুলকায়। এটি অনেক সময় ওরাল অ্যালার্জি সিনড্রোমের কারণে হয়। এতে মুখ বা গলায় চুলকানি বা ঝিনঝিন অনুভূতি হয়।
কিছু ক্ষেত্রে বেগুনে অ্যালার্জি থেকে অ্যানাফাইল্যাক্সিসের মতো সমস্যাও হতে পারে। এটি জীবন ঝুঁকিপূর্ণ জরুরি অবস্থা। এর লক্ষণগুলো হলো, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, শ্বাসের সময় শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া, গলা ফুলে যাওয়া, জিহ্বা ফুলে যাওয়া, খাবার গিলতে সমস্যা হওয়া, মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া, মাথা ঘোরা, ত্বকে র্যাশ, খুব দুর্বল লাগা, বমি ভাব। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে বা জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। যদি আপনার কাছে এপিনেফ্রিন অটো-ইনজেক্টর থাকে, তাহলে একজন চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী এটি দ্রুত ব্যবহার করুন।
হালকা অ্যালার্জি হলে অনেক সময় অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধ খেলে উপকার পাওয়া যায়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। প্রথমবার বেগুন খাওয়ার পর অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যান। প্রয়োজনে তিনি রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত করবেন, বেগুনে আপনার অ্যালার্জি আছে কি না।
বেগুনে অ্যালার্জি থাকলে বেগুন এবং নাইটশেড পরিবারের অন্যান্য খাবারও এড়িয়ে চলা ভালো। এ ছাড়া স্যালিসাইলেট থাকা খাবার এড়িয়ে যান। বেগুনে স্যালিসাইলেট নামে একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক থাকে। কিছু মানুষের এতে অ্যালার্জি হতে পারে। এই রাসায়নিক আরও যেসব খাবারে থাকে, সেগুলো হলো আপেল, আঙুর, ফুলকপি, শসা, মাশরুম, পালংশাক, জাম্বুরা ইত্যাদি।
এমনকি অনেক সময় কাঁচা বেগুন স্পর্শ করলেও ত্বকে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া হতে পারে।
বেগুনে অ্যালার্জির কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই। তবে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সব ধরনের বেগুন খাওয়া এড়িয়ে চলুন, গুরুতর অ্যালার্জির ঝুঁকি থাকলে এপিনেফ্রিন অটো-ইনজেক্টর সঙ্গে রাখতে পারেন, স্কুল, ভ্রমণ বা বাইরে খাওয়ার জন্য অ্যালার্জি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করুন এবং খাবারের লেবেল পড়ার অভ্যাস করুন। এ ছাড়া রান্নার সময় অন্য খাবারের সঙ্গে বেগুন মিশে যাওয়া এড়িয়ে চলুন।
সূত্র: হেলথ লাইন এবং এনওয়াই অ্যালার্জি অ্যান্ড সাইনাস সেন্টারস