তারুণ্য ধরে রাখতে মরিয়া পৃথিবীর মানুষ। কোনোভাবেই তারা বৃদ্ধ হতে চায় না। তাই বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করে চলেছেন পৃথিবীর খ্যাতনামা বিজ্ঞানীরা। কখনো সেসব গবেষণায় মেলে সাফল্য, আবার কখনো অপেক্ষা করতে হয় আরও ব্যাপক গবেষণা ফলের জন্য। এবারও বিজ্ঞানীরা তেমনি একটি গবেষণা করছেন চকলেটের ওপর। অবশ্য বলা ভালো, চকলেটের মূল উপাদান কোকো বীজের ওপর চলছে গবেষণা।
চকলেট এমনই একটি জিনিস, যার জনপ্রিয়তার কোনো বয়সভেদ নেই। জন্মদিনের কেক হোক কিংবা মাঝরাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা—চকলেট আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্প্রতি গবেষকেরা চকলেটের সেই চিরচেনা স্বাদের বাইরে গিয়ে এর মূল উপাদান কোকো বিন বা কোকো বীজের দিকে নজর দিয়েছেন। সেই বিনে পাওয়া একটি প্রাকৃতিক উপাদান বিজ্ঞানীদের কৌতূহলী করে তুলেছে। তাঁরা খেয়াল করেছেন, সেই উপাদান আমাদের কোষের বুড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া প্রভাবিত করতে পারে। কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক রামি সাদের নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন একটি গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, কোকো বিনের একটি বিশেষ উপাদান আমাদের বায়োলজিক্যাল এজিং বা জৈবিক বার্ধক্য ধীর করে দিতে পারে।
মানবজাতির জন্য কি এটি বিশেষ কোনো শুভ বার্তা? এখনো চলছে গবেষণা। তাই নিশ্চিত হতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
বয়স মানে কি শুধু জন্মদিনের সংখ্যা
বিজ্ঞানীদের মতে, বয়স শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। আমরা কত বছর বেঁচে আছি, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, আমাদের কোষগুলো কতটুকু কার্যকর। একই বছরে জন্ম নেওয়া দুজন মানুষের শরীরে বার্ধক্য আসতে পারে ভিন্ন সময়ে। এর কারণ হতে পারে তাদের খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং জীবনযাত্রার ধরন। গবেষকেরা ১ হাজার ৬০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে কোষের ভেতরের সেই আণবিক সংকেত বা মলিকিউলার টাইমস্ট্যাম্প খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন।
চকলেটের এক বিস্ময়কর অণু
গবেষণায় হাজারো উপাদানের মধ্যে থিওব্রোমিন নামে একটি বিশেষ অণুর কথা উঠে এসেছে বারবার। কোকোতে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এই উপাদান আমাদের শরীরে বার্ধক্য কমানোর সংকেত হিসেবে কাজ করে। থিওব্রোমিন ক্যাফেইনের সমগোত্রীয় হলেও এর প্রভাব অনেক বেশি শান্ত। ক্যাফেইন যেমন হঠাৎ শক্তি বাড়িয়ে আবার কমিয়ে দেয়, থিওব্রোমিন তা করে না। এটি রক্তে ধীরে ধীরে মিশে যায় এবং শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রশান্তি ও সতেজতা দেয়। আমাদের ডিএনএর ভেতরে থাকা একধরনের রাসায়নিক ট্যাগিং সিস্টেম দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, শরীর কত দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে। দেখা গেছে, যাদের রক্তে থিওব্রোমিনের মাত্রা বেশি, তাদের কোষগুলো অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি তরুণ ও কর্মক্ষম।
কেন কোকো অনন্য
সাধারণত আমরা চা বা কফি থেকে যে উদ্দীপনা পাই, কোকোর প্রভাব তার চেয়ে আলাদা। গবেষকেরা দেখেছেন, কফি বা চায়ের প্রভাব বাদ দিলেও থিওব্রোমিনের নিজস্ব একটি ভূমিকা আছে, যা বার্ধক্য রোধে সাহায্য করে। এটি শরীরে প্রদাহ কমায়, রক্তসঞ্চালন বাড়ায় এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। ল্যাবরেটরিতে পরিচালিত প্রাথমিক পরীক্ষায় সাধারণ কিছু প্রাণীর আয়ু বাড়াতেও এই উপাদানের প্রভাব দেখা গেছে।
বাস্তবতা বনাম সতর্কতা
গবেষকেরা উৎসাহী হলেও একটি বিষয়ে আমাদের সতর্ক করেছেন। এই গবেষণা মূলত সম্পর্ক নিয়ে, কার্যকারণবিষয়ক নয়। অর্থাৎ, থিওব্রোমিন বেশি থাকলে বার্ধক্য ধীর হয়, এটা সত্যি। কিন্তু থিওব্রোমিনই কি একা এই কাজ করছে, নাকি অন্যান্য ভালো অভ্যাস এর পেছনে শক্তি জোগাচ্ছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, চকলেট মানেই ভালো কিছু নয়। বাজারজাত চকলেটে থাকা অতিরিক্ত চিনি ও চর্বি কোকোর গুণাগুণ নষ্ট করে দিতে পারে। তাই উপকার পেতে হলে ডার্ক চকলেট বা চিনি ছাড়া কোকো পাউডার খাওয়ার দিকে নজর দিতে হবে। চকলেট কোনো জাদুকরি অমৃত নয় যে এটি খেলে রাতারাতি বয়স কমে যাবে। এটি একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের অংশ হতে পারে মাত্র।
সূত্র: হেলথলাইন, স্টাডি ফাইন্ডস, ন্যাচারাল ফুড সিরিজ