উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ বিবিএ বা ব্যবসায় প্রশাসনে পড়তে আগ্রহী হন। তবে এ অনুষদের কোন বিষয়টি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার ও উচ্চশিক্ষার জন্য বেশি কার্যকর, এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই দ্বিধা কাজ করে। বর্তমানে দক্ষতাভিত্তিক কর্মক্ষেত্র, নেতৃত্ব বিকাশ এবং বহুমুখী পেশাগত সুযোগের কারণে ব্যবস্থাপনা এখন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত। দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও করপোরেট খাতে এর চাহিদাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ব্যবস্থাপনায় পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মতামত দিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জনি।
বর্তমান বিশ্বে শুধু ভালো একাডেমিক ফলই যথেষ্ট নয়; বরং নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যবস্থাপনা এমন একটি বিষয়, যেখানে এসব দক্ষতা একসঙ্গে বিকশিত হয়। দেশের করপোরেট খাত, ব্যাংকিং সেক্টর, বহুজাতিক কোম্পানি, স্টার্টআপ এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলো এখন এমন গ্র্যাজুয়েট খুঁজছে, যাঁরা টিম পরিচালনা, কৌশল নির্ধারণ এবং বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে সক্ষম।
ব্যবস্থাপনায় মূলত শেখানো হয় কীভাবে মানুষ, সম্পদ এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে দক্ষভাবে সমন্বয় করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা যায়। এটি শুধু তাত্ত্বিক বিষয় নয়; বরং বাস্তবজীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান এবং নেতৃত্বের একটি প্রক্রিয়াভিত্তিক শিক্ষা।
বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা মানে শুধু অফিস ব্যবস্থাপনা নয়; একজন ম্যানেজারকে একই সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতা, বাজার পরিস্থিতি, গ্রাহকের চাহিদা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বিবেচনায় নিতে হয়। এই শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা শেখেন—কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন; সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ; সীমিত সম্পদে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন; দল পরিচালনা ও সমন্বয়; দ্বন্দ্ব নিরসন, সময় ব্যবস্থাপনা এবং চাপের মধ্যে কাজ করার দক্ষতা।
দেশে অনেকের ধারণা, ম্যানেজমেন্ট একটি সহজ বিষয়, যেখানে মুখস্থ করলে ভালো ফল সম্ভব। কেউ কেউ আবার মনে করেন, এটি শুধু অফিস পরিচালনা বা কাজ ভাগ করে দেওয়ার বিদ্যা। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ব্যবস্থাপনা একটি কৌশলগত ও বিশ্লেষণভিত্তিক ডিসিপ্লিন, যেখানে মানব আচরণ বিশ্লেষণ, নেতৃত্ব প্রদান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণ, সংকট মোকাবিলা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো গভীরভাবে শেখানো হয়। এসব বিষয় গভীরভাবে শেখানো হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন হ্রাস পেলে একজন ম্যানেজারকে একসঙ্গে কর্মীদের মনোবল, বাজার পরিস্থিতি, ব্যয় কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে সমাধান দিতে হয়। অর্থাৎ এটি শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং নেতৃত্ব ও কৌশলগত চিন্তার সমন্বয়। বর্তমানে গুগল, মাইক্রোসফট, ইউনিলিভার, টয়োটার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব দক্ষতাকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
ম্যানেজমেন্টে পড়াশোনার পর ক্যারিয়ার ক্ষেত্র অত্যন্ত বিস্তৃত। সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক—সব খাতেই এর সুযোগ রয়েছে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোতে এইচআর এক্সিকিউটিভ, ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার (এমটিও), অপারেশনস ম্যানেজার, সাপ্লাই চেইন এক্সিকিউটিভ, অ্যাডমিন অফিসার ও প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবস্থাপনা শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ব্র্যাক, ইউনিসেফ, ইউএনডিপি, ওয়ার্ল্ড ভিশন, সেভ দ্য চিলড্রেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও উন্নয়ন সংস্থায় প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ও প্রশাসনিক কাজে ম্যানেজমেন্ট গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা রয়েছে। ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ব্যাপক। বাংলাদেশে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ, এক্সিকিউটিভ এমবিএ, এমফিল ও পিএইচডি করার সুযোগ রয়েছে।
বিদেশে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্কলারশিপে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিজনেস অ্যানালাইটিকস, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন ও গ্লোবাল লিডারশিপের মতো আধুনিক ক্ষেত্রগুলোতে ম্যানেজমেন্ট গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়ছে।
গ্রন্থনা: আফসান জানি