সাক্ষাৎকার

শক্তিশালী জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থা খুবই জরুরি: রানা ফ্লাওয়ার্স

বাংলাদেশে জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ দায়িত্ব পালন করছেন। শিশু উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও নীতি প্রণয়নে তাঁর ৩৫ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর আগে তিনি ভিয়েতনাম, চীন, কম্বোডিয়া, মঙ্গোলিয়া ও বেলিজে ইউনিসেফের প্রতিনিধি ছিলেন। বাংলাদেশে শিশু ও জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত নানা বিষয়; যেমন ইউনিসেফের অগ্রাধিকার, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টিহীনতা, টিকাদান, জলবায়ু পরিবর্তন ও শিশু সুরক্ষা নিয়ে তিনি আজকের পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ

প্রশ্ন: দেড় বছরের বেশি সময় ধরে আপনি বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন। তিন দশকের বেশি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে কাজের অভিজ্ঞতাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রানা ফ্লাওয়ার্স: আগামী আগস্টে এখানে আমার দুই বছর পূর্ণ হবে। বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় দেশ—আশায় ভরা একটি দেশ। এখানকার মানুষ অসাধারণ দৃঢ় ও সহনশীল। তবে একই সঙ্গে দেশটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি।

প্রশ্ন: গত কয়েক দশকে শিশু সুরক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। ইউনিসেফের দৃষ্টিতে কোন ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সাফল্য এসেছে এবং কোথায় এখনো জরুরি মনোযোগ প্রয়োজন?

রানা ফ্লাওয়ার্স: ইউনিসেফের দৃষ্টি সব সময়ই থাকে—কীভাবে শিশুদের জীবনের সর্বোত্তম সম্ভাব্য সূচনা নিশ্চিত করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের টিকাদান, মানসম্মত ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে তাদের সুরক্ষা দেওয়া। এই ধরনের বিনিয়োগ একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য শক্ত ভিত গড়ে তোলে।

বাংলাদেশের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ এবং নারী ও শিশু সুরক্ষার মতো সামাজিক খাতে তুলনামূলকভাবে কম বিনিয়োগ। অতীতে বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে এসব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাগুলো এখনো প্রত্যাশিত শক্তি অর্জন করতে পারেনি। স্বাস্থ্য খাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগের ভারসাম্য।

তুলনামূলকভাবে বেশি বিনিয়োগ হয়েছে তৃতীয় স্তরের বা বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবায়, কিন্তু প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের বসবাসের কাছাকাছি প্রদান করা হয় এবং এটি সবচেয়ে সহজলভ্য ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী স্তর। এখানে রোগ প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া হয়, যাতে মানুষকে পরে হাসপাতালে যেতে না হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত চাপে রয়েছে, তাই কমিউনিটি পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা প্রয়োজন। একটি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পুষ্টি। পরিবার ও পিতামাতাকে বুঝতে হবে যে শিশু ও কিশোরদের জন্য সঠিক পুষ্টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এটি শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাগত অর্জনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। গত এক দশকে বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমেছে। জন্মনিবন্ধন এবং বাল্যবিবাহের মতো ক্ষেত্রেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। পুষ্টির ক্ষেত্রে খর্বতার হার কমেছে, যা ইতিবাচক। তবে সাম্প্রতিক মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভেতে শিশুদের মধ্যে কৃশতার হার বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে, যা উদ্বেগজনক। অনেক পরিবার এখন পর্যাপ্ত খাবার নিশ্চিত করতে সংগ্রাম করছে। বাংলাদেশের আরেকটি বড় সাফল্য হলো শিশুদের জন্য টিকা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা। টিকা গ্রহণের হার অসাধারণ। তবে কয়েকবার টিকার সাময়িক ঘাটতি দেখা গেছে, যা সময়মতো টিকাদানে বাধা সৃষ্টি করে। অথচ টিকা রোগ প্রতিরোধ করে, হাসপাতালের ওপর চাপ কমায় এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

প্রশ্ন: এমআইসিএস ২০২৫-এ কিছু সূচককে গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কোন বিষয়গুলো আপনাকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করেছে এবং কেন?

রানা ফ্লাওয়ার্স: জরিপটি কিছু ইতিবাচক দিকও দেখিয়েছে—কোন কোন ক্ষেত্রে ভালোভাবে কাজ হচ্ছে তা বোঝা গেছে। তবে কিছু ক্ষেত্র সতর্কসংকেতও দিচ্ছে, যেগুলোর দিকে আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জন্মনিবন্ধন। একটি শক্তিশালী জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থা ছাড়া জানা সম্ভব নয় কত শিশু স্কুলের বাইরে বা কত শিশু টিকা পায়নি। জন্মনিবন্ধন শিশুর প্রথম অধিকার এবং এটি নিশ্চিত করে যে সে সমাজের গণনায় অন্তর্ভুক্ত, মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। বাংলাদেশে জন্মনিবন্ধনের হার এখনো তুলনামূলকভাবে কম, যা বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, ইউনিসেফও সহায়তা দিতে প্রস্তুত। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিসার বিষক্রিয়া। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮ শতাংশ নারী এতে আক্রান্ত এবং অর্ধেকের বেশি শিশুর শরীরে সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ঢাকার ধনী এলাকায় হার তুলনামূলকভাবে বেশি। সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা এবং আচরণে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ জন্য উৎস শনাক্ত ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। তৃতীয় বিষয় হলো ওয়েস্টিং বা কৃশতা—শিশুর উচ্চতার তুলনায় ওজন কম থাকা। এর হার বেড়েছে, তবে কার্যকর সমাধানও আছে। ‘রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড’ শিশুদের মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে এবং এটি এখন বাংলাদেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষিত পুষ্টি কর্মকর্তারা ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে খাদ্যসহায়তা দিতে পারেন। একবার শিশু গুরুতর কৃশতায় আক্রান্ত হলে হাসপাতাল খরচ অনেক বেশি, তাই প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুশ্রম। গত পাঁচ বছরে আগের জরিপের তুলনায় এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা সতর্কতার সংকেত।

প্রশ্ন: পুষ্টিহীনতা এখনো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শিশুদের পুষ্টি সংকট; যেমন স্ট্যানটিং (খর্বকায়তা), ওয়েস্টিং (কৃশতা) এবং অণুপুষ্টির ঘাটতি কমাতে ইউনিসেফ সরকারকে কীভাবে সহায়তা করছে?

রানা ফ্লাওয়ার্স: ইউনিসেফ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং তাদের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। যদি জীবনের প্রথম হাজার দিনে সঠিক পুষ্টিনীতি গ্রহণ না করা হয়, তাহলে শিশুদের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারিয়ে যায়। আমরা দুটি সময়কাল চিহ্নিত করি—প্রথম হাজার দিন এবং কিশোর বয়স। প্রথমটি মূলত একটি শক্তিশালী পুষ্টি কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য, যাতে তারা শিশুদের পরীক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের শনাক্ত করতে পারে। দ্বিতীয় বিষয় হলো নিশ্চিত করা যে শিশুদের চিকিৎসা ও পুষ্টি সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য সহজলভ্য। সম্ভব হলে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ‘রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড’ বা হাসপাতাল ব্যবহারের পণ্য শিশুদের জন্য সরবরাহ করা হবে। এটি সারা দেশে সহজলভ্য হওয়া উচিত, যাতে পরিবারগুলো দূরে যেতে না হয়। তৃতীয় বিষয় হলো পিতামাতাদের কাছে পৌঁছানো এবং বোঝানো যে সঠিক পুষ্টি শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থ বিষয় হলো সরকারের কিছু নতুন উদ্যোগ, যেমন ফ্যামিলি কার্ড, যা দরিদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সরকারি সহায়তা; যেমন খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা বা পুষ্টি পণ্য পেতে সহায়তা করে। সব মিলিয়ে এসব উদ্যোগ জন্মনিবন্ধনের সঙ্গেও যুক্ত। জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করলে আমরা জানতে পারি শিশুরা কোথায় আছে এবং তারা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে কি না। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

প্রশ্ন: নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি এবং এইচপিভি, রোটাভাইরাস ও পিসিভি টিকা প্রয়োগে বাংলাদেশের অগ্রগতি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রানা ফ্লাওয়ার্স: নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে টিকাদান এবং টিকা প্রচারণা বিশ্বমানের। জনবহুল দেশে যা খুবই কঠিন, তবে বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে প্রায় ৮৫ শতাংশ শিশুকে নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, যা অসাধারণ ফলাফল। এর ফলে রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আমি অবাক হয়েছি যে, গ্রামীণ এলাকায় টিকাদানের হার শহরের তুলনায় বেশি। বিশ্বের অন্য কোথাও আমি এমন দেখিনি। সম্ভবত কারণ হলো শহরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সাধারণত স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়। ফলে শহরের শিশুরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পর্যাপ্ত সুবিধা পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিশ্চিত করা জরুরি যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সবার জন্য টিকাদান পরিচালনা করবে গ্রামীণ হোক বা শহরে, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিশু টিকা পায়। শহরে জনসংখ্যা অত্যধিক এবং জলবায়ু সংকটসহ বিভিন্ন কারণে স্থানান্তরিত হওয়া মানুষও বেশি। গত এক বছরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ টিকা চালু হয়েছে। একটি হলো, শিশুদের টাইফয়েড কনজুগেট টিকা। প্রায় ৯২ শতাংশ জনসংখ্যা এই টিকা পেয়েছে, যা সিস্টেমের কার্যকারিতা প্রমাণ করে। দ্বিতীয়টি হলো এইচপিভি টিকা, যা কিশোরীদের ক্যানসার প্রতিরোধে দেওয়া হয়। এটি সুনির্দিষ্ট জনসংখ্যার প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা সিস্টেমের কার্যকারিতা এবং মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া বিশ্বাসের প্রমাণ। মানুষ বুঝেছে যে এই টিকাগুলো কঠোর মানদণ্ড পূরণকারী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আসে, এগুলো মানসম্মত এবং সঠিকভাবে সংরক্ষিত। এই জ্ঞান থেকেই মানুষ এগিয়ে এসে টিকা গ্রহণ করেছে, এবং এর ফলাফল সত্যিই চমৎকার হয়েছে।

প্রশ্ন: কিশোরীদের স্বাস্থ্য সমস্যা, মাতৃস্বাস্থ্য এবং অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইউনিসেফ কোন কৌশলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে?

রানা ফ্লাওয়ার্স: মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভেতে কিশোরী মেয়েরা বিয়ের উচ্চ হারের বিষয়টি অবাক এবং উদ্বিগ্ন করেছে। এই দেশের কিশোরী মেয়েদের বিয়ে এখনো খুব সাধারণ। বিষয়টি বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যাকে টেনে আনে। উদাহরণস্বরূপ, ১৫–১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার বেশি। এই বয়সের শরীর সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ফলে জটিলতার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ ছাড়া কিশোরী মেয়েদের মধ্যে রক্তশূন্যতার হারও খুব বেশি। তাদের নবজাতক শিশুদের মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি। বিবাহবিচ্ছেদও এই বয়সে বেশি দেখা যায়। বাল্যবিবাহের বিষয়ে পরিবারের যুক্তি শুনি, যারা এর মাধ্যমে তাদের সন্তানদের মর্যাদা রক্ষা করতে চায়। তখন প্রশ্ন করি, বাল্যবিবাহে সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় মারা যাওয়া বা কিশোরী বয়সে তালাক পাওয়া কি মর্যাদাপূর্ণ? এই বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব বুঝতে পারে। পুষ্টির দিক থেকেও কিশোরী মেয়েরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। ভিটামিন, খনিজ এবং অন্যান্য সম্পূরক তাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন, যা বর্তমান স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের মাতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঠিক ব্যবস্থাপনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সহিংসতাও বড় উদ্বেগের বিষয়। কিশোরী মেয়েরা ক্রমবর্ধমান লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এ ছাড়া অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি অনেকটাই শৈশব থেকেই তৈরি হয়—গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে পুষ্টি ও আচরণ এসব নির্ধারণ করে। অতএব একটি সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। যাতে কিশোরী মেয়েদের জন্য শক্তিশালী স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং মানসিক স্বাস্থ্যভিত্তি তৈরি করা যায়। নারীরাই অনানুষ্ঠানিক কাজের বড় অংশে (প্রায় ৯০ শতাংশ) থাকলেও স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যবিমায় সমান সুযোগ পায় না। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ আছে। বাংলাদেশে কিশোরী এবং কিশোর উভয়ের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পর্যাপ্ত সহায়তা নেই।

প্রশ্ন: বাল্য/কিশোরী বিয়ে, সহিংসতা এবং অনলাইন শোষণ (এক্সপ্লয়টেশন) এখনো বড় হুমকি হিসেবে রয়েছে। শিশু সুরক্ষা শক্তিশালী করতে ইউনিসেফ কি কোনো নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে? এ পর্যন্ত অগ্রগতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রানা ফ্লাওয়ার্স: ইউনিসেফ সব ক্ষেত্রেই ছোট প্রকল্প বা সীমিত পরিসরের কাজ করে না। আমরা জাতিসংঘের অংশ হিসেবে মূলত সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলি, যা প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সব শিশুর জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে শিক্ষা নিয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে কাজ করি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাতেও একইভাবে কাজ করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদার ও এনজিওর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করি। শিশু সুরক্ষা এবং এই সমস্যার নিয়ে কাজ করতে শুধু মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করা বা তহবিল পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আমরা শিশুর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন বিষয়গুলো বিবেচনায় আনি। উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্যকর্মী ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, প্রয়োজনীয় পুষ্টি সামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করা, এগুলো সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ। পাশাপাশি সচেতনতা ও প্রচারণায় কাজও করি। মানুষকে সচেতন করতে কিছু কার্যকর উপকরণ রয়েছে, যেমন ‘মিনা’, যা সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং শিশুর সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়। সমস্যা শুধু রাস্তায় বা বাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়; অনলাইনেও এটি বিস্তার পাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান নির্যাতনমূলক আক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে, যা এমন বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে যে তারা শিক্ষিত বা কাজ করার অধিকার রাখে না। আমি মনে করি, ইতিবাচক কণ্ঠগুলোকে সামনে আনা জরুরি।

প্রশ্ন: শহরে মানুষের অভিবাসনের কারণে বস্তি এলাকায় চাপ বেড়েছে। এই ধরনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শহুরে পরিবেশে থাকা শিশুদের জন্য ইউনিসেফ কীভাবে সহায়তা করছে?

রানা ফ্লাওয়ার্স: আমরা জাতীয় পর্যায়ে পরিবর্তন আনার দিকে লক্ষ্য রাখি। তবে একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতিও মনোযোগ দিই। উদাহরণস্বরূপ যারা স্থানান্তরিত হয়ে কড়াইল বস্তির মতো এলাকায় বসবাস করছে, তারা ইউনিসেফের কাজের বিশেষ লক্ষ্য। আমরা শিশু ও তাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ১১টির বেশি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করি। বস্তি এলাকায় আমরা ‘হোল অব চাইল্ড’ বা পূর্ণাঙ্গ শিশু কল্যাণ পদ্ধতি গ্রহণ করেছি। এর অর্থ আমরা শুধু টিকা প্রয়োগে সীমাবদ্ধ রাখি নই। স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শিশু সুরক্ষাও রয়েছে। প্রতিটি বস্তিতে শিশু সুরক্ষা দল ও কেন্দ্র গঠন করা হয় যেখানে স্থানীয় জনগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা পায়। উদাহরণস্বরূপ কোনো শিশুকে বিবাহে বাধ্য করা হলে বা কোনো নারীকে বাড়িতে নির্যাতন করা হলে সুরক্ষা দল সেখানে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এর ফলে কমিউনিটিভিত্তিক পরিবারগুলোকে আরও বেশি সহায়তা দেওয়া যায় এবং শিশুর ওপর বা পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর যে ধরনের নির্যাতন বা অন্যায় ঘটে, তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। এ ছাড়া আমরা বস্তি এলাকায় উদ্ভাবনী পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করেছি যাতে মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা পায়। স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণেও আমরা সহায়তা করি, যাতে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত হয় এবং সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নত হয়।

প্রশ্ন: দুর্যোগপ্রবণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইউনিসেফ কোন বড় বাধার মুখোমুখি হচ্ছে?

রানা ফ্লাওয়ার্স: জলবায়ু সংকট শিশুদের সব ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রভাব ফেলছে। অন্য কোনো বয়সী জনগোষ্ঠীর তুলনায় শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশে এই সংকটের কারণে শিশুদের ওপর প্রভাব বিশ্বে শীর্ষ অবস্থায়। প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—প্রতিরোধ এবং প্রস্তুতির প্রতি যথাযথ মনোযোগের অভাব। একটি মন্ত্রণালয় দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা নেয়, যা প্রশংসনীয়। তবে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ-২০২৪ সালে ফেনী ও নোয়াখালীতে বন্যা হয়েছিল। তখন হাসপাতালগুলো প্রস্তুত ছিল না; সব সরঞ্জাম বেসমেন্টে রাখা থাকায় অনেক হারিয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও পাঠ্যপুস্তক মেঝেতে স্তূপ করা ছিল, যা নষ্ট হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল ভবনের অভাব রয়েছে। আমরা চাই জলবায়ু-বান্ধব বিদ্যালয় ও হাসপাতাল, যাতে সৌর প্যানেল, লিথিয়াম ব্যাটারি এবং অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশে এই ধরনের উপকরণে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়। ফলে মনোযোগ ভুল দিকে যাচ্ছে। যদি আমরা প্রকৃতভাবে পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে ভাবি এবং কমিউনিটিগুলোর ওপর প্রভাব কমাতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি তাহলে আমাদের সকল দিক বিবেচনা করতে হবে, যার মধ্যে কর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত। জলবায়ুসংকটের আরও একটি প্রতিবন্ধকতা হলো—আমরা যে এলাকাগুলোতে কাজ করি, সেগুলো প্রায়ই বন্যার কবলে পড়ে। যদিও সংগঠিত ব্যবস্থা আছে। কর্মীদের পরিবর্তনশীলতাও বড় চ্যালেঞ্জ। কেন্দ্র সমন্বয়কারী, নার্স, ডাক্তার ও শিক্ষকেরা প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর চলে যান। এক কমিউনিটির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জনসংখ্যার এই আসা-যাওয়া লক্ষ্য অর্জনে বাধা দেয়। তাই শিশুদের সুরক্ষা ও সম্প্রদায়ের সহনশীলতা বাড়াতে একটি স্থিতিশীল, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য।

প্রশ্ন: বড় পরিসরের কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইউনিসেফ কীভাবে সরকারের সঙ্গে দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং শক্তিশালী অংশীদারত্ব নিশ্চিত করে?

রানা ফ্লাওয়ার্স: আমাদের লক্ষ্য হলো সরকারের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সমন্বয় করা। আমরা নতুন সরকারের নীতি বোঝার চেষ্টা করি, যাতে চিহ্নিত করা যায় কোন ক্ষেত্রে আমাদের সহায়তা সবচেয়ে প্রয়োজন। শিশু অধিকার-সংক্রান্ত কনভেনশন অনুসরণ করে আমরা জানি কোন পদ্ধতি কার্যকর। আমরা সব সময় বড় চিত্রটি দেখতে চাই। আমাদের দলকে উৎসাহিত করা হয় ১০ বছরের একটি ভিশন তৈরি করতে, শিশুদের জন্য আমরা কী পরিবর্তন চাই এবং সরকারের সঙ্গে মিলিত হয়ে তা কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব। সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় ধাপও আমরা পরিকল্পনা করি। একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি, যাতে কাজের দিকনির্দেশনা পরিষ্কার হয় এবং মূল অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা যায়; যেমন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবারের জন্য পুষ্টি সহায়তা উন্নয়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন। এই অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলোতে আমাদের পরিষ্কার লক্ষ্য রয়েছে। আমরা গত বছর শিশুদের সঙ্গে কথা বলেছি, নীতি গবেষণা কেন্দ্র ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে মতবিনিময় করেছি এবং একটি শিশু অধিকার ঘোষণাপত্র চিহ্নিত করেছি। এতে নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রগুলো শনাক্ত হয়েছে। দেশের ১২টি বড় রাজনৈতিক দলও এই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। নতুন সরকার ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ শুরু করেছে—সামাজিক খাতে বাজেট বৃদ্ধি, ফ্যামিলি কার্ড ও ই-হেলথ কার্যক্রম। পাশাপাশি জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

প্রশ্ন: আগামী পাঁচ বছরের জন্য ইউনিসেফ বাংলাদেশের শীর্ষ তিনটি অগ্রাধিকার কী?

রানা ফ্লাওয়ার্স: প্রথম বছরের প্রধান অগ্রাধিকার হলো জন্মনিবন্ধন। আমরা সরকারের সহায়তায় পিছিয়ে থাকা শিশুদের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করার জন্য প্রস্তুত, যাতে প্রতিটি শিশুর জন্ম সঠিকভাবে নথিভুক্ত হয়। পরবর্তী পাঁচ বছরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, ভালো পুষ্টির ব্যবস্থা এবং জীবাণুমুক্ত পানি, পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশন কার্যক্রমে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া। সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতার মানদণ্ড পূরণ করে। তাই আমাদের আরও কাজ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সিসা বিষক্রিয়া। আমরা যে বিপজ্জনক মাত্রার সিসা পর্যবেক্ষণ করেছি, তা মানুষের স্বাস্থ্যে গুরুতর প্রভাব ফেলে। এ ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। তৃতীয়ত, বিশেষভাবে নারী ও শিশুদের ওপর সংঘটিত সহিংসতা কমানো জরুরি। তবে শুধু মেয়েরা নয়, ছেলেদের জন্যও সঠিক সেবা-সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, জলবায়ুসংকটের বিষয়ে বিভিন্ন খাতের সমন্বয় ও সম্পৃক্ততার মাধ্যমে কমিউনিটিকে দুর্যোগ প্রতিরোধে সক্ষম করা।

টিকা কেনা নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ইউনূসের বিশেষ সহকারী

এক হাজার কিমি খাল খনন করা হবে ১৮০ দিনে: শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি

আমার অঙ্গীকার মাদক-সন্ত্রাস নির্মূল: অনিন্দ্য ইসলাম অমিত

আমার লড়াই আমি চালিয়ে যাব: রুমিন ফারহানা

ভোট নিয়ে ভোটারদের মতো সন্দিহান আমিও

গবেষণা ফান্ড পাওয়ার বেশ কিছু উৎস আছে

ছোটখাটো শিল্পনগরী গড়ে তুলতে চাই মাদারীপুরে: আনিসুর রহমান তালুকদার

ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, প্রতিহিংসা চাই না: ইয়াসের খান চৌধুরী

জিতলে ভোট ভালো, হারলে ভোট খারাপ, এটা না: মো. আসাদুজ্জামান

ভালো গবেষণা যেন দুর্বল ইংরেজিতে নষ্ট না হয়