পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ভেতরে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এবার সেই ভাঙ্গনের ধাক্কা লাগল লোকসভায়। লোকসভায় দলটির ২৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জনই এবার দল ছাড়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। আইনি জটিলতা এড়াতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি ত্রিপুরার একটি স্বল্পপরিচিত রাজনৈতিক দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টির সাথে একীভূত হতে যাচ্ছে।
আজ রোববার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সাথে দেখা করে একটি চিঠি জমা দেওয়ার পর এই ঘোষণা দেন ২০ সংসদ সদস্য।
এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিদ্রোহী দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রবীণ তৃণমূল নেত্রী ও লোকসভার সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার। স্পিকারের কাছে চিঠি হস্তান্তরের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। আমরা এখন থেকে এনডিএ জোটের অংশ হিসেবে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কাজ করব এবং সংসদে পৃথকভাবে বসব।’
বিদ্রোহীদের এই আকস্মিক দলত্যাগের ফলে লোকসভায় তৃণমূলের শক্তি যেমন একধাক্কায় তলানিতে ঠেকেছে, তেমনি আসন্ন বাদল বা বর্ষাকালীন অধিবেশনের আগে নিম্নকক্ষে বিরোধী শিবিরের মোট আসন সংখ্যাও হ্রাস পেল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, লোকসভায় সম্পূর্ণ পৃথক একটি ব্লক তৈরি করতে গেলে যে অনিবার্য আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হতো, তা এড়াতেই অন্য একটি দলের সাথে একীভূত হওয়ার এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং একদম শেষ মুহূর্তে বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়া প্রবীণ সংসদ সদস্য সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমরা ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টির সাথে একীভূত হব, এটি একটি আঞ্চলিক দল। এটাই আইনি নিয়ম। আপনি যখন দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য নিয়ে দল ত্যাগ করবেন, তখন প্রথম দিনই আপনি মূল দলের নাম দাবি করতে পারেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী জুলাই মাসে আমরা স্পিকারের কাছে তৃণমূল নামটি আমাদের দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক দাবি জানাবো। কারণ তৃণমূলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আমাদের সাথে আছে। এরপর আদালত এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এই পদক্ষেপকে তৃণমূলের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন দলটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা মদন মিত্র। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘তাঁরা তৃণমূলের প্রতীকে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচন লড়েছিলেন। এখন তাঁরা সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছেন। এটি স্রেফ প্রতারণা ও জালিয়াতি।’
তৃণমূল এই দলত্যাগের বিরুদ্ধে আদালতে যাবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মদন মিত্র জানান, বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে বিদ্রোহীদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবির জবাবে তিনি বলেন, ‘একটি পৃথক দল গঠনের জন্য এই সংখ্যাটি খুবই ছোট। এর পেছনে অনেক আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। এটি তো কেবল শুরু।’
এদিকে বিদ্রোহীরা স্পিকারের সাথে দেখা করার আগেই আজ সকালে তৃণমূলের পক্ষ থেকে বড় ধরনের আইনি প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। দলের সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ এবং কীর্তি আজাদ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সাথে দেখা করে তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড তথা সংসদীয় দলের প্রধান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চিঠি জমা দেন। ওই চিঠিতে বিদ্রোহীদের কোনো ধরনের স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য স্পিকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছিল।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেন, আইনসভা বা সংসদের ভেতরের দলটির নিজস্ব কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। এটি মূল রাজনৈতিক দলেরই একটি অংশ বা বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তাই কোনো সদস্য বা সদস্যদের দল নিজের ইচ্ছামতো একই দলের সমান্তরাল কোনো গোষ্ঠী বা উপদল তৈরি করে সংসদের ভেতরে স্বাধীন স্বীকৃতির দাবি জানাতে পারে না।
আদালতের একটি প্রাসঙ্গিক রায়ের বরাত দিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয়, দেশের আইন কোনো রাজনৈতিক দলের উপদলীয় বিভাজনকে বৈধতা দেয় না। বরং এই ধরনের আচরণকে দলত্যাগ বা অযোগ্যতার আওতায় ফেলে বিচার করা হয়। স্পিকার মূলত মূল রাজনৈতিক দলকেই স্বীকৃতি দেন, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলকে নয়। সংবিধানের দশম তফশিলের ২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একাধিক গোষ্ঠী যখন মূল দলটির মালিকানা দাবি করে, তখন স্পিকারের কাজ হলো প্রকৃত রাজনৈতিক দল কোনটি তা নির্ধারণ করা, কোনো উপদলকে স্বাধীন স্বীকৃতি দেওয়া নয়।