ভারতের কেরালা রাজ্যের কাসারগড় জেলা। কৃষিনির্ভর এই এলাকায় কাজু বাদামের চাষ হয়। এছাড়াও চা, ধান ও আমও ফলানো হয় এখানে। একটা সময় দেখা গেল, এই অঞ্চলের পশু-পাখি বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নিচ্ছে, এমনকি মারাও যাচ্ছে। একটা সময় পর এই সমস্যা দেখা গেল সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যেও। এমনকি বাড়তে লাগল বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধির প্রাদুর্ভাব। তখন টনক নড়ে উঠল সবার। পরীক্ষা করে দেখা গেল, এন্ডোসালফান নামে এক কীটনাশক এই বিপর্যয় ডেকে এনেছে। আর ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাসারগড়ের মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছে এই বিপর্যয়ের প্রভাব।
এন্ডোসালফান নামে সস্তা কিন্তু অত্যন্ত বিষাক্ত কীটনাশকটির ফলে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে ওই এলাকায় জন্ম নেওয়া শিশুরা ভুক্তভোগী হয়েছে দুরারোগ্য ব্যাধির। বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু করে টানা ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাসারগড়ের কাজু বাদাম বাগানে বছরে দুই থেকে তিনবার এই কীটনাশক ছিটিয়েছে কেরালা প্ল্যান্টেশন কর্পোরেশন। পরবর্তীতে চা, ধান ও আম চাষেও এটি ব্যবহার করা শুরু হয়।
নব্বইয়ের দশকে স্থানীয় বাসিন্দারা লক্ষ্য করেন, গৃহপালিত পশু ও শিশুদের মধ্যে জন্মগত ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে ছিল সেরিব্রাল পালসি, মৃগীরোগ এবং হাইড্রোসেফালাস (মস্তিষ্কে তরল জমা হওয়া)-এর মতো শারীরিক ও স্নায়বিক জটিলতা। এ ছাড়া চর্মরোগ, হরমোনজনিত সমস্যা, হাঁপানি এবং ক্যানসারের মতো মরণব্যাধিও দেখা দেয়। কিছু পরিবেশবাদী সংগঠন এবং কেরালা সরকার পরবর্তীতে এসবের জন্য এন্ডোসালফান বিষক্রিয়াকে দায়ী করে।
ভারতের কিছু বিজ্ঞানী এন্ডোসালফানের সঙ্গে এসব রোগের যোগসূত্র নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাঁদের মতে, এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব রয়েছে। তবে ২০০৪ সালে কেরালার দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড এই কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়।
২০১১ সালে ‘স্টকহোম কনভেনশন অন পারসিস্টেন্ট অর্গানিক পলিউট্যান্টস’ বিশ্বজুড়ে এন্ডোসালফান উৎপাদন ও ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। একই বছর ভারতের সুপ্রিম কোর্টও দেশজুড়ে এর উৎপাদন, বিক্রি ও রপ্তানি নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
সম্প্রতি কেরালার বার্ষিক সমসাময়িক শিল্পকলা প্রদর্শনী ‘কোচি-মুজিরিস বিয়েনাল’-এ এন্ডোসালফান ট্র্যাজেডি নামে কীটনাশকের প্রভাবে বিকলাঙ্গ এবং অস্বাভাবিক বড় মাথা নিয়ে জন্ম হওয়া শিশুদের আলোকচিত্র দেখানো হয়েছে। আলোকচিত্রী মধুরাজ তুলে ধরেছেন দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কেরালার কাসারগড় জেলায় এন্ডোসালফানের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শত শত শিশুর স্বাস্থ্যগত সংকটের চিত্র।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাসারগড়ের এই সংকট নিয়ে কাজ করছেন আলোকচিত্রী মধুরাজ। কীটনাশকের প্রভাবে কীভাবে মানুষের জীবন ধ্বংস হয়েছে, তা বুঝতে তিনি বারবার ভুক্তভোগীদের বাড়িতে গিয়েছেন। মধুরাজ বিবিসিকে বলেন, ‘আমি নিজ চোখে দেখেছি, এই কীটনাশক কীভাবে একেকটি পরিবারকে নিঃশেষ করে দিয়েছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘অনেক পরিবারে একাধিক শিশু শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মেছে, যাদের যত্ন নেওয়া পরিবারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বয়স্ক মানুষ নিজে অসুস্থ শরীর নিয়ে তাঁদের পঙ্গু জীবনসঙ্গীর সেবা করতে হিমশিম খাচ্ছেন।’
ভুক্তভোগীদের অনেকেই ছিলেন দরিদ্র শ্রমিক। তাঁদের পরিবারগুলো মূলত সুবিধাবঞ্চিত নিম্নবর্ণ এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের, যাদের পুষ্টিকর খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট কেরালা সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার ভুক্তভোগীর প্রত্যেককে ৫ লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন। তবে আলোকচিত্রী মধুরাজ দাবি করেন, অনেক ভুক্তভোগী এখনো এই অর্থ পাননি বলে তাঁকে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বিবিসির পক্ষ থেকে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ এবং ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে নাগরিক সমাজ, পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয়রা এন্ডোসালফান নিষিদ্ধের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। বছরের পর বছর ধরে বাবা-মায়েরা তাঁদের অসুস্থ শিশুদের কোলে নিয়ে ক্ষতিপূরণ ও সুচিকিৎসার দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভ করেছেন।
মধুরাজ বলেন, এই পরিবারগুলো বছরের পর বছর বাইরে আন্দোলন করার পাশাপাশি ঘরেও বড় সংগ্রাম চালিয়েছে, আর তা হলো সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা। মধুরাজের ভাষায়, ‘আমি যতবার এই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে গিয়েছি, আমার মনে হয়েছে কেরালা এই ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া মানুষদের প্রতি সঠিক বিচার করেনি।’
এই বিয়োগান্তক ঘটনার এক চরম উদাহরণ হলো বিমলা ও তাঁর মেয়ে রেশমা। রেশমা জন্মগতভাবেই মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। মা যখন কাজে যেতেন, নানি তাঁর দেখাশোনা করতেন। ২০১৪ সালে তাঁর নানি মারা যাওয়ার পর মা বিমলাই রেশমাকে দেখাশোনা করতেন। ২০১৯ সালে করোনা মহামারির সময় রেশমার বিশেষ স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালে রেশমার বয়স যখন ২৮, তখন বিমলা তাঁর মেয়েকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেন বলে পুলিশ জানায়। দীর্ঘ লড়াইয়ে একাকী পেরে না উঠেই বিমলা এই চরম পথ বেছে নেন বলে পুলিশের ধারণা।
কোচি-বিয়েনালের মতো প্রদর্শনীতে মধুরাজের এই ছবিগুলো কীটনাশকে একটি প্রজন্মের বিপর্যস্ত হয়ে পড়া তুলে ধরেছে বিশ্বের কাছে। মধুরাজ বলেন, ‘এমন দুর্যোগ এবং মানুষের জীবনের এই বিশাল মূল্য যেন আমরা ভুলে না যাই।’