হলিউডের সিনেমা যদি শুধু যুক্তরাষ্টে মুক্তি পেত? অথবা বলিউডের সিনেমা শুধু ভারতের মানুষ দেখত? লগ্নির অর্ধেক আয় করা সম্ভব ছিল না। হলিউডের অনেক সিনেমা চীনে আগে মুক্তি দেয়। আবার বলিউডের অনেক সিনেমা ভারতের চেয়ে আগে দুবাইয়ে মুক্তি পায়।
আমরা শুধু এক দেশের মার্কেট বিবেচনাতেই সিনেমা নির্মাণ করি ও মুক্তি দিই। বলিউডের সিনেমা দুবাই কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে মুক্তি দেওয়ার কারণ কী? সহজ হিসাব, অসংখ্য ভারতীয় দুবাই কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে বাস করে, যাদের মধ্যে বলিউড আসক্তি আছে।
সিনেমা নির্মাণের আগে ভাবতে হবে মুক্তি দেবেন কোথায়। ক্রমেই বাংলাদেশে হলের সংখ্যা কমছে। কিন্তু আপনি তো সিনেমা বানিয়ে বাংলাদেশের হলের দিকে চেয়ে থাকবেন। তাহলে কি সিনেমা নির্মাণ করবেন না? উপায় একটা আছে, টেলিভিশন প্রিমিয়ার। কিন্তু সেখানে আপনি কতই–বা বাজেট পাবেন। পাশের দেশ ভারত যেখানে হাজার কোটি হাঁকাচ্ছে ছবিপ্রতি। শতকোটি তো হচ্ছে নিয়মিত। সেখানে আমরা ১ কোটি বাজেট তুলতেই হিমশিম খাচ্ছি।
বাজার–ভাবনা
আমাদের সিনেমায় বিস্তর তর্ক বহুদিন ধরে চলছে, সিনেমার বাজার নাকি ভালো সিনেমা আগে। বড় বাজার না হলে বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বাজেট সাধারণত যেখানে থাকে ১ কোটি। সেখানে একটু বড় মাপের ছবি ১০০ কোটি বলিউডে, ১০ কোটিরও নিচে তো সম্ভবই নয়। আর হলিউডের বাজার থাকে ৮ হাজার কোটি টাকাও।
প্রবাস কেন বড় মার্কেট
এক কানাডায় সব মিলিয়ে দেড় লাখের বেশি বাংলাদেশির বসবাস, যার সিংহভাগ থাকে টরন্টোতে, প্রায় ৭৫ হাজার। নিউইয়র্কে ৫ লাখেরও বেশি বাঙালির বসবাস। বিভিন্ন শহর মিলিয়ে আমেরিকাতে মোট বাংলাদেশি থাকে প্রায় ৮-৯ লাখ। সারা বিশ্বে যতজন প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস করে, তাদের সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করে। প্রায় ২৮ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করে, যাদের অর্ধেক সৌদি আরবে এবং চার ভাগের এক ভাগ আরব আমিরাতে বসবাস করে। সৌদি আরবে ২০ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে। ৩ লাখের বেশি প্রবাসী বাঙালি কাতারে বাস করে। অস্ট্রেলিয়া, কোরিয়া, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের আরও অনেক দেশে অসংখ্য বাঙালি বাস করে। প্রবাসীরা অপেক্ষা করে কবে বাংলা সিনেমা মুক্তি পাবে। একটু খোঁজ নিয়ে ইউটিউব দেখলেই বোঝা যায় বাংলাদেশের নাটক–সিনেমার ভিউয়ার প্রবাসীদের কাছ থেকেই বেশি আসে।
উঁচুমানের বিনোদনমূলক সিনেমা। সে সিনেমা যে হলিউড স্টাইলে হতে হবে তা নয়। দেশের সংস্কৃতি নিয়ে ভালো মানের ছবি। শিকড় টান দেয় এমন গল্প। আমাদের বীরত্বগাথা যেসব গল্প আছে। সেটা অ্যানিমেটেডও হতে পারে। প্রবাসীরা যেন অনুভব করে, এটি বাংলাদেশের সিনেমা। বাজার বড় হলে সিনেমার বাজেটও বাড়বে। দেশীয় পণ্যের স্পনসরও মিলতে পারে।
একটা সহজ হিসাব
ঢাকা অ্যাটাক সিনেমাটির উদাহরণ দিয়েই বলি। কানাডায় সিনেমাটির আয় ৭৪,০০০ ডলার। বাংলাদেশি মূল্যে ৫১,০৪,৫২০ টাকা। এটা গ্রস কালেকশন। যে দেশে সিনেমাটি রিলিজ হয় সেই দেশের সরকারকে এই টাকা থেকে ট্যাক্স দিতে হয় ১০%। সেক্ষেত্রে এই ১০% (৫১,০৪,৫২০ × ১০%) = ৫,১০,৪৫২ বাদ দেওয়ার পরে নেট কালেকশন দাঁড়ায় (৫১,০৪,৫২০ - ৫,১০,৪৫২) = ৪৫,৯৪,০৬৮ টাকা এটাই হচ্ছে নেট বক্স অফিস আয়। এখান থেকে মাল্টিপ্লেক্স পাবে ৫৫%, পরিবেশক পাবেন ২২% আর প্রযোজক পাবেন ২৩%। তাহলে আমাদের প্রযোজক ঢাকা অ্যাটাক থেকে পেয়েছেন (৪৫,৯৪,০৬৮ × ২৩%) = ১০,৫৬,৬৩৬ টাকা।
প্রযোজক যে টাকাটা পাচ্ছেন এই সংখ্যাটা আপাত দৃষ্টিতে কম মনে হলেও এই জার্নিটা তো শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে দেশের সিনেমা বিদেশে প্রসার লাভ করলে সেটা ১ লাখ ডলার থেকে ৫ বা ১ মিলিয়নও হতে পারে। নিয়মিত ছবি মুক্তি পেলে আগ্রহী হবেন প্রবাসী সাধারণ বাঙালিরাও।
বাংলাদেশের সিনেমা বিদেশে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে জনপ্রিয় এবং নির্ভরতার নাম স্বপ্ন স্কেয়ারক্রো। সেই প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা মো. অলিউল্লাহ সজীব। থাকেন কানাডায়। বর্তমানে কানাডা, আমেরিকা, দুবাই, ওমানসহ বেশ কয়েকটি দেশে বাংলা ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করছে স্বপ্ন। আমেরিকার বিশ্বখ্যাত চেইন ‘রিগ্যাল’ , ‘সিনেমার্ক’ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ‘ভক্স’–এর সঙ্গে এনলিস্টেড। সজীব বলেন, ‘মিনিমাম টু কে রেজল্যুশনের ক্যামেরায় ছবিটি শুট করা হতে হবে। এর সাবটাইটেল থাকতে হবে। এসব গোছানো হলেই ছবিটি আমরা আমাদের যেসব মাল্টিপ্লেক্স রয়েছে, সেখানে পাঠাব। ছবি হলগুলোতে পাঠানো, সেন্সর করানো, এর প্রচার-প্রচারণার সব খরচ আমরাই বহন করব। প্রযোজককে শুধু ভার্চ্যুয়াল প্রিন্ট ফি (ভিপিএফ)টা দিতে হয়। আর প্রযোজকের মুনাফা পাওয়ার হিসাবটাও সহজ। রেনট্রাক (কমস্কোর) নামে সারা পৃথিবীর বক্স অফিস ডেটাবেইস আছে, যেখানে সব মাল্টিপ্লেক্স রিপোর্ট করে। যেখান থেকে জানা যায় কোন ছবিটি কত টাকা আয় করেছে। গ্রস বক্স অফিস আয় থেকে ১৩-১৫ শতাংশ (কানাডা ও আমেরিকায় ১৩ শতাংশ। তবে কিছু কিছু দেশে ১৪ এবং ১৫ শতাংশ) ট্যাক্স কেটে রাখার পর যে আয়টা থাকে, সেটাকে বলা হয় নিট আয়। তার থেকে কোনো কোনো দেশের মাল্টিপ্লেক্স ৫০ শতাংশ নেয়, কোনো কোনো দেশে নেয় ৫৫ শতাংশ। কেউ কেউ আবার ছবি ভালো চললে ২-৪ শতাংশ বোনাস দেয়। আমরা ‘আয়নাবাজি’ চালিয়ে কানাডার ‘সিনেপ্লেক্স’ থেকে ২ শতাংশ বোনাস পেয়েছিলাম। যাক, তো মাল্টিপ্লেক্স তার ভাগ নেওয়ার পর যেটা থাকে, সেটার ফিফটি ফিফটি আমাদের এবং প্রযোজকের মধ্যে ভাগ হয়। এটা খুবই সহজ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি।’
নিয়মিত ছবি মুক্তি দরকার
অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বেশ কয়েকজন চলচ্চিত্রপ্রেমী কাজ করছেন বিশ্ব দুয়ারে বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে। তবে ভারতীয় সিনেমার মতো তা সপ্তাহজুড়ে প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না। একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট শো প্রদর্শনের মাধ্যমেই শেষ করতে হয়েছে। উল্লেখ্যযোগ্যসংখ্যক নয়, তবুও একটি সিনেমা প্রদর্শনকালের সময় থেকে অন্যটির জন্য অনেক দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতীয় চলচ্চিত্র সমগ্র অস্ট্রেলিয়ায় সপ্তাহব্যাপী চলে। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী সব কমিউনিটির দর্শকদের মুখে মুখে ভারতীয় সিনেমার উচ্চ প্রশংসা। ক্ল্যাসিফিকেশন বোর্ড ও দীর্ঘমেয়াদি নানা নিয়মকানুন আছে। আমাদের সরকারের উচিত অ্যাম্বাসির সঙ্গে কথা বলা, যেভাবে সহজ উপাায়ে মুক্তি দেওয়া সম্ভব।
সাব্বির চৌধুরী, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলা সিনেমার পরিবেশক
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে আমরা আয়োজন করেছিলাম ড্রাইভ-ইন শো। ড্রাইভ-ইন শোতে বড় মাঠে রাখা পর্দায় চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। দর্শকেরা গাড়ি নিয়ে সেই পর্দার সামনে গাড়ি রেখে গাড়ির ভেতরে বসেই সিনেমা উপভোগ করেন। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত দুই বাঙালি আকাশ আহসান ও ওয়াহেদ সিদ্দিকীর মাথায় এটি প্রথম আসে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করতে গিয়ে ড্রাইভ-ইন শো দেখেছেন তাঁরা। এটি বাংলা সিনেমার জন্য নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার মতো। এই পদ্ধতিতে বাংলা সিনেমা আরও ছড়িয়ে যাবে। অনেক ছবি ইংরেজিতে ডাব করে দেখানো হবে, তাই বাংলা ভাষাভাষী ছাড়াও অন্য ভাষার সিনেমাপ্রেমীরা বাংলাদেশের সিনেমা উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। এতে ছবির প্রযোজকেরাও বাড়তি আয়ের সুযোগ পাবেন। ইউরোপের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই প্রদর্শনী দারুণ জনপ্রিয়।
দীপংকর দীপন, চিত্রপরিচালক