সিনেমার বাজারে ক্রমেই অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বর্তমানে বিপুল প্রচার আর দুর্দান্ত কনটেন্ট ছাড়া বক্স অফিসে সাফল্যের কোনো গ্যারান্টি নেই। তার ওপর দিন দিন বাড়ছে তারকাদের পারিশ্রমিক। এমন পরিস্থিতিতে বড় বাজেটের সিনেমার লোকসান কমাতে এবং ব্যবসাসফল হলে লাভের অঙ্ক বাড়াতে এক অভিনব পথ বেছে নিতে চলেছে তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।
তামিল প্রযোজকেরা এখন অভিনেতা ও কলাকুশলীদের পারিশ্রমিকের প্রথাগত নিয়মের বদলে ‘রেভিনিউ শেয়ারিং’ মডেল চালুর কথা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছেন। সম্প্রতি সিনেমা স্ট্র্যাটেজিস্ট নামক ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন খ্যাতনামা প্রযোজক জি ধনঞ্জয়ন।
জি ধনঞ্জয়ন জানান, তামিল প্রযোজকেরা সিনেমার মোট আয়ের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের মধ্যে বণ্টন করতে প্রস্তুত আছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি নতুন কৌশল তৈরি করেছি। যখন আমরা কোনো বড় সিনেমা নির্মাণ করব, তখন প্রযোজক মোট আয়ের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সেসব শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের দিতে রাজি আছেন, যাঁরা এই চুক্তিতে সই করবেন। আর অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ আয় থেকে প্রযোজকেরা সিনেমার নির্মাণ খরচ তুলে নেবেন এবং নিজেদের লভ্যাংশ রাখবেন।’
চলচ্চিত্র ব্যবসায় রেভিনিউ শেয়ারিং এমন এক আধুনিক পারিশ্রমিক মডেল, যেখানে তারকা বা কলাকুশলীরা কোনো নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক নেন না। সিনেমার মোট আয় বা গ্রস রেভিনিউ থেকে চুক্তি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ তাঁরা পান পারিশ্রমিক হিসেবে। অর্থাৎ টিকিট বিক্রি, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা স্যাটেলাইট রাইটস বিক্রি করে যত টাকা আসবে, সেখান থেকে নির্মাণ বা বিপণন খরচ বাদ দেওয়ার আগেই তার একটি পার্সেন্টেজ পাবেন তারকারা।
এই নিয়মের বড় সুবিধা হলো, সিনেমা যদি ফ্লপও হয়, তবে প্রযোজককে একা দেউলিয়া হতে হবে না। আবার সিনেমা ব্লকবাস্টার হলে সবাই মিলে সেই সাফল্যের অংশীদার হবেন। নিজের লাভ জড়িয়ে থাকায় তারকারাও সিনেমাটি সফল করতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করবেন।
ভারতীয় সিনেমায় আমির, সালমান বা শাহরুখ খানের মতো শীর্ষ তারকারা দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রফিট শেয়ারিং’ মডেলে কাজ করছেন। এ পদ্ধতিতে সিনেমার মোট আয় থেকে নির্মাণ, প্রচারণা, পরিবেশকের কমিশনসহ যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে যদি বাড়তি কোনো লাভ থাকে, তবেই সেখান থেকে চুক্তি অনুযায়ী অংশ দেওয়া হয়।
প্রফিট শেয়ারিংয়ে অনেক সময় নানা খরচ দেখিয়ে আসল লাভ লুকিয়ে ফেলা যায়, কিন্তু রেভিনিউ শেয়ারিংয়ে মোট টিকিট বিক্রির হিসাব থাকে একদম পরিষ্কার। প্রফিট শেয়ারিংয়ে তারকাকে অপেক্ষা করতে হয় সিনেমার সব খরচ উঠে আসা পর্যন্ত। অনেক সময় এর জন্য মাসের পর মাস লেগে যায়। কিন্তু রেভিনিউ শেয়ারিংয়ে সিনেমা মুক্তির প্রথম দিন, প্রথম শো থেকেই আয়ের টাকা ভাগ হওয়া শুরু হয়। ফলে তারকারা দ্রুত তাঁদের টাকা পেয়ে যান। তাই বর্তমান বাজারে রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলটি বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে।
তেলুগু মেগাস্টার আল্লু অর্জুন কয়েক বছর ধরে রেভিনিউ শেয়ারিং মডেল মেনে চলছেন। চলতি বছরের মার্চে মুক্তি পাওয়া বলিউডের ‘ধুরন্ধর ২’ সিনেমার জন্য একই কৌশল নিয়েছিলেন রণবীর সিং।
প্রযোজক জি ধনঞ্জয়ন বলেন, ‘আল্লু অর্জুন কয়েক বছর ধরে এই কাজ বেশ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই করে আসছেন। তিনি তাঁর সব সিনেমার আয়ের একটি অংশ নেন। যদি সিনেমাটি অভাবনীয় সাফল্য পায় এবং ১৫০০-২০০০ কোটি রুপি আয় করে, আল্লুর পারিশ্রমিকও সেই অনুপাতে বাড়ে। ধুরন্ধর ২ সিনেমার জন্য রণবীর সিংও একই কাজ করেছেন। সিনেমাটি যদি সব মিলিয়ে ২০০০ কোটি রুপি আয় করত, তাহলে একই হারে তিনিও ৬০০ কোটি পেতেন।’
নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের চেয়ে এই নতুন মডেল কীভাবে তারকাদের জন্য বেশি লাভজনক হতে পারে, তা স্পষ্ট করেছেন ধনঞ্জয়ন। তিনি বলেন, ‘ধরুন, ১৫০ কোটি রুপি বাজেটে তৈরি একটি সিনেমা বক্স অফিসে ৩০০ কোটি আয় করল। এখন কোনো অভিনেতা যদি ৩০ শতাংশ রেভিনিউ শেয়ারিং চুক্তিতে থাকেন, তবে তিনি পাবেন ৯০ কোটি। কিন্তু এটি যদি প্রফিট শেয়ারিং মডেল হতো, তবে নির্মাণ খরচ ১৫০ কোটি বাদ দিয়ে বাকি ১৫০ কোটি টাকার লাভের ওপর ৩০ শতাংশ হিসাব করা হতো, সে ক্ষেত্রে অভিনেতা পেতেন মাত্র ৪৫ কোটি। অর্থাৎ সিনেমা বাম্পার হিট হলে রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলে তারকাদের আয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে।’
তবে তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একটি অংশ এখনো পুরোপুরি এই পরিকল্পনা মেনে নিতে পারেনি বলে জানান প্রযোজক জি ধনঞ্জয়ন। নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের নিশ্চিত ব্যবস্থা ছেড়ে অনিশ্চিত আয়ের এই মডেলে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যে এখনো কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব, শঙ্কা ও আপত্তি রয়েছে। তবে প্রযোজকদের আশা, সিনেমার বাজার টিকিয়ে রাখতে আগামী দিনে এই ব্যবসায়িক মডেলই ভারতীয় সিনেমার ভবিষ্যৎ হয়ে উঠবে।