সাক্ষাৎকার

গবেষণার উদ্দেশ্য, ধারণা ও ফল স্পষ্টভাবে তুলে ধরা

বর্তমান জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বে গবেষণা শুধু একাডেমিক প্রয়োজন নয়। এটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে আগ্রহী হলেও অনেক শিক্ষার্থী মানসম্পন্ন গবেষণাপত্র লেখার কৌশল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না। গবেষণার পরিকল্পনা, সাহিত্য পর্যালোচনা, একাডেমিক লেখার কৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যবহার এবং গবেষণার নৈতিকতা নিয়ে কথা বলেছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি)-এর সিএসই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ফিরোজ মৃধা। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবিদ আনজুম ত্রিদিব

আপনি যখন প্রথম গবেষণাপত্র লিখতে বসলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল? সেটি কীভাবে কাটিয়ে উঠেছিলেন?

আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গবেষণাপত্রের কাঠামো এবং একাডেমিক লেখার ধরন বোঝা। শুরুতে মনে করতাম, বেশি তথ্য সংগ্রহ করলেই ভালো গবেষণাপত্র লেখা সম্ভব। পরে বুঝেছি, শুধু তথ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়। সেই তথ্যকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করতে হয়। একই সঙ্গে গবেষণার মাধ্যমে নতুন কিছু অবদানও তুলে ধরতে হয়। এই দক্ষতা অর্জনের জন্য নিয়মিত মানসম্পন্ন গবেষণা নিবন্ধ পড়তাম। অভিজ্ঞ গবেষকদের কাছ থেকে মতামত নিতাম। প্রতিটি খসড়া একাধিকবার সংশোধন করতাম। গবেষণা লেখার দক্ষতা এক দিনে তৈরি হয় না। ধারাবাহিক অনুশীলন, ধৈর্য এবং শেখার মধ্য দিয়েই তা গড়ে ওঠে।

একটি মানসম্পন্ন গবেষণাপত্র লেখার আগে কীভাবে পরিকল্পনা করা উচিত? বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে আপনি কোন ধাপগুলো অনুসরণ করেন?

আমি সাধারণত কয়েকটি ধারাবাহিক ধাপে কাজ করি। প্রথমে এমন একটি গবেষণার বিষয় নির্বাচন করি, যা সময়োপযোগী এবং যেখানে নতুন কিছু জানার বা সমাধান দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এরপর গভীরভাবে সাহিত্য পর্যালোচনা করি। এতে বোঝা যায়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগে কী ধরনের গবেষণা হয়েছে এবং কোথায় গবেষণার ফাঁক বা সুযোগ রয়েছে।

পরবর্তী ধাপে উদ্দেশ্য, গবেষণা-প্রশ্ন এবং সম্ভাব্য হাইপোথিসিস নির্ধারণ করি। পাশাপাশি গবেষণার পদ্ধতি, ব্যবহৃত ডেটাসেট, মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য ফল নিয়েও আগাম পরিকল্পনা করি। সবশেষে পুরো গবেষণাপত্রের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করি। সেখানে ভূমিকা, পূর্ববর্তী গবেষণা, গবেষণা পদ্ধতি, ফলাফল, আলোচনা এবং উপসংহার—সব অংশের বিন্যাস নির্ধারণ করা থাকে। আমার বিশ্বাস, একটি ভালো পরিকল্পনা গবেষণার অর্ধেক কাজকে সহজ করে দেয়।

অনেক শিক্ষার্থী সাহিত্য পর্যালোচনা লিখতে গিয়ে শুধু সারসংক্ষেপ করেন, বিশ্লেষণ করেন না। এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?

সাহিত্য পর্যালোচনার উদ্দেশ্য শুধু কে কী করেছেন, তা তুলে ধরা নয়। এর মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন গবেষণার শক্তি, সীমাবদ্ধতা এবং পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা। আমি শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিই, প্রতিটি গবেষণাপত্র পড়ার সময় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। যেমন: গবেষণার উদ্দেশ্য কী ছিল, কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, কী ফল পাওয়া গেছে, গবেষণাটির সীমাবদ্ধতা কোথায় এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার সুযোগ কোথায়। যখন একজন শিক্ষার্থী একই বিষয়ের একাধিক গবেষণাকে তুলনা করে বিশ্লেষণ করতে শেখে, তখন সাহিত্য পর্যালোচনা আর শুধু তথ্যের সারসংক্ষেপ থাকে না। বরং তা বিশ্লেষণধর্মী আলোচনায় পরিণত হয়। এর মাধ্যমে গবেষণার ফাঁকও স্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে নতুন গবেষণার যৌক্তিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।

গবেষণার ভাষা একাডেমিক রাখতে গিয়ে অনেকের লেখা জটিল ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। স্পষ্ট, সহজ অথচ একাডেমিক ভাষায় লেখার ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?

একাডেমিক ভাষা মানেই কঠিন বা দুর্বোধ্য ভাষা নয়। একটি ভালো গবেষণাপত্র এমন হওয়া উচিত, যেন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের গবেষকেরা সহজেই বুঝতে পারেন। আমি সব সময় ছোট ও স্পষ্ট বাক্য ব্যবহার করার চেষ্টা করি। অপ্রয়োজনীয় জটিল বা বাহুল্যপূর্ণ ভাষা এড়িয়ে চলি। প্রতিটি অনুচ্ছেদে একটি নির্দিষ্ট ধারণা উপস্থাপনের দিকেও গুরুত্ব দিই। লেখা শেষ হওয়ার পর সেটি উচ্চ স্বরে পড়ে দেখি। এতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সহজেই ধরা পড়ে। গবেষণার উদ্দেশ্য পাঠককে কঠিন ভাষায় মুগ্ধ করা নয়। বরং গবেষণার ধারণা ও ফল স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। তাই সরলতা ও স্পষ্টতাই একাডেমিক লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

প্লেজারিজম বা তথ্য চুরি বর্তমানে একটি বড় সমস্যা। সঠিক রেফারেন্সিং এবং একাডেমিক সততা বজায় রাখার ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের কী করা উচিত?

প্লেজারিজম এড়িয়ে চলা শুধু নিয়ম মানার বিষয় নয়। এটি একজন গবেষকের নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের উচিত অন্যের লেখা হুবহু কপি না করে নিজের ভাষায় উপস্থাপন করা। পাশাপাশি মূল উৎসের কৃতিত্ব দেওয়া। গবেষণার শুরু থেকে Zotero, Mendeley বা EndNote-এর মতো রেফারেন্স ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ব্যবহার করলে তথ্যসূত্র ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ হয়। এ ছাড়া যে জার্নালে গবেষণাপত্র জমা দেওয়া হবে, সেই জার্নালের নির্ধারিত সাইটেশন স্টাইল অনুসরণ করা উচিত। জমা দেওয়ার আগে প্লেজারিজম চেকারের মাধ্যমে লেখাটি পরীক্ষা করাও প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া। এটিই একজন গবেষকের সততা, নৈতিকতা ও পেশাদারত্বের পরিচয়।

এআই টুল ও বিভিন্ন সফটওয়্যার এখন গবেষণায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো কি গবেষণার মান বাড়াচ্ছে, নাকি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে?

আমার মতে, এআই একটি শক্তিশালী সহকারী। তবে এটি কখনোই গবেষকের বিকল্প হতে পারে না। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এআই সাহিত্য পর্যালোচনার উপকরণ সংগ্রহে সহায়তা করে। লেখার ভাষা উন্নত করে। কোডিং ও ডেটা বিশ্লেষণে সহায়তা করে। ভাষা ও কাঠামো আরও পরিপাটি করতে পারে। তবে কেউ যদি পুরোপুরি এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তার সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা বিশ্লেষণের দক্ষতা এবং নতুন ধারণা তৈরির ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এআইকে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে নয়। গবেষণার মূল চিন্তা, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত অবশ্যই গবেষকের নিজের হওয়া প্রয়োজন। সব সময় মনে রাখতে হবে, ‘এআই কেবল সহকারী, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়।’

লেখা শেষ হলেই কি গবেষণা সম্পন্ন? রিভিশন বা পুনর্লিখনের প্রক্রিয়াটি আপনি কীভাবে দেখেন এবং এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?

একটি গবেষণাপত্রের প্রথম খসড়া খুব কম ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত মানের হয়। অনেক সময় প্রকৃত কাজ শুরু হয় লেখার পরবর্তী সংশোধন পর্বে। রিভিশনের সময় আমি প্রথমে দেখি যুক্তির ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কি না। এরপর গবেষণার উদ্দেশ্য ও ফলের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা মূল্যায়ন করি। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিই। ভাষা ও ব্যাকরণ আরও পরিষ্কার করি। সহকর্মী বা সুপারভাইজারের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনও করি। বাস্তবে একটি মানসম্পন্ন গবেষণাপত্র একাধিকবার রিভিশনের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতা পায়।

যেসব শিক্ষার্থী এখন গবেষণা শুরু করতে চাইছেন, তাঁদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?

গবেষণাকে শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের উপায় হিসেবে দেখবেন না। এটিকে শেখার একটি দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা হিসেবে গ্রহণ করুন। শুরুতে বড় সাফল্যের প্রত্যাশা করবেন না। নিয়মিত গবেষণাপত্র পড়ুন। প্রশ্ন করতে শিখুন। ছোট ছোট সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন। সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলুন। মনে রাখতে হবে, একজন ভালো গবেষকের পরিচয় শুধু তিনি কতটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি কতটা কৌতূহলী, কতটা সৎ এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে কতটা অবদান রাখতে পেরেছেন—সেটিই একজন গবেষকের প্রকৃত পরিচয়। ধারাবাহিক শেখা, ধৈর্য এবং সততাই একজন সফল গবেষকের সবচেয়ে বড় শক্তি।

কানাডায় উচ্চশিক্ষা: শিক্ষার্থীরা কানাডায় পৌঁছে প্রথম সপ্তাহে যা করবেন

গানের মুগ্ধ এবার প্রশাসনে

হর্টিকালচার নিয়ে পড়াশোনা মাটির সঙ্গে স্মার্ট ক্যারিয়ার

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসায় কড়াকড়ি, অবস্থানের সুযোগ সীমিত হচ্ছে

চট্টগ্রাম বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ স্থগিত

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে ‘সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট’ মেজর চালু

প্রথম পত্রের বদলে দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র, ২৫ মিনিট পর দেওয়া নতুন প্রশ্নপত্রও গত বছরের

চীনে উচ্চশিক্ষা: স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি গবেষণার সুযোগ

যুক্তরাষ্ট্রে ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ পেলেন জবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ৬ শিক্ষার্থী

টেকাথন ন্যাশনালসে দুই বিভাগে চ্যাম্পিয়ন সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা