রংপুরের পীরগঞ্জের চতড়া ইউনিয়নের কুমারপুর উচ্চবিদ্যালয়। গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় ৫৪ জনের মধ্যে ২৯ জন পাস করেছিল এখান থেকে। এক বছরের ব্যবধানে সেই বিদ্যালয়ের ১৮ পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। অথচ বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৯ জন শিক্ষক ও ৬ জন কর্মচারী রয়েছেন।
কারণ জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘সিসি ক্যামেরার ভয়ে শিক্ষার্থীরা এমন ফল করেছে।’ আরেক শিক্ষক দায় দিলেন অভিভাবকদের অসচেতনতাকে।
বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক কহিনুর বেগমের কক্ষ খালি। অন্য কক্ষে কয়েকজন শিক্ষক বসে আছেন। শ্রেণিকক্ষগুলোতে ছিল ১৫-১৬ জন শিক্ষার্থী।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল খালেক বলেন, ‘এবার আমাদের বাচ্চারা একটু ভিতু ছিল। সিসি ক্যামেরা ছিল, ভয়ে শিক্ষার্থীরা এমন ফল করেছে। আশা রাখি আগামী দিনে ভালো করব।’
একই ইউনিয়নের ঘাষিপুর উচ্চবিদ্যালয়। সেখানেও এবার এসএসসিতে পাসের হার শূন্য। বিদ্যালয়টি থেকে ১৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে কেউই পাস করতে পারেনি। অথচ ২০২৫ সালে ২০ জনের মধ্যে ১১ জন উত্তীর্ণ হয়েছিল।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঘাষিপুর উচ্চবিদ্যালয় ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে চারজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। সরেজমিন সব পরীক্ষার্থী ফেল করার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজার রহমান এই প্রতিবেদকের ওপর চড়াও হন। পরে তিনি মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমার নতুন এমপিওভুক্ত স্কুল, মাত্র চারজন শিক্ষক। এটা একটা বড় সমস্যা। এ কারণে স্কুলটা জরাজীর্ণ।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, ‘যে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শোকজ করা হবে।’
এদিকে তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের বটতলী নমিরুল দাখিল মাদ্রাসাতেও এবার পাঁচ পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেনি। প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাদ্রাসাটিতে ১৪ জন শিক্ষক ও ৩ জন কর্মচারী রয়েছেন।
কোনো স্কুলে ১২ জন শিক্ষক, পরীক্ষার্থীও ১২ জন। আবার কোনোটিতে শিক্ষক ১৬ জন, পরীক্ষার্থী মাত্র ৪ জন। তবু এসব স্কুল থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। কুড়িগ্রামে এই বছর চারটি স্কুলে পাসের হার শূন্য। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হলো জেলার রাজারহাট উপজেলার তালতলা উচ্চবিদ্যালয়, একই উপজেলার ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চবিদ্যালয়, সদর উপজেলার পূর্ব কুমরপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।
রাজারহাট উপজেলার কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা তালতলা উচ্চবিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায়। এবার প্রথমবার বিদ্যালয়টি থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
উপজেলার আরেক স্কুল ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চবিদ্যালয় ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত। ২০২২ সালে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায়। নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষক থাকলেও মাধ্যমিক পর্যায়ের কোনো শিক্ষক নেই।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে চার শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করেনি। ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায়। এ ছাড়া সদর উপজেলার পূর্ব কুমরপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ এ এম রথবাড়ী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষায় ৫ জন শিক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে। এই প্রতিষ্ঠানে ১১ জন শিক্ষক রয়েছেন।
জানা যায়, উপজেলার মদাতী ইউনিয়নে নারীশিক্ষার প্রসারে ১৯৯৯ সালে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয়রা। ২০১১ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে বিদ্যালয়টি নিম্নমাধ্যমিক থেকে উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২০০। শিক্ষক রয়েছেন ১১ জন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বিপ্লব মদাতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। বেতনের সময় বেতন আর লোকদেখানো হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন তাঁরা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বিপ্লব জানান, নিম্নমাধ্যমিকের শিক্ষকেরা বেতন পেলেও উচ্চমাধ্যমিক শাখা এমপিওভুক্ত হয়নি। শিক্ষকেরা বেতন-ভাতা না পেয়ে অনেকটা আগ্রহ হারিয়েছেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বদরুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব।’
সিরাজগঞ্জের কামারাখন্দ উপজেলার চরটেংরাইল দাখিল মাদ্রাসা থেকে এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই শিক্ষার্থীর দুজনই ফেল করেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ১২-১৩ জন শিক্ষক থাকলেও তাঁদের কেউই নিয়মিত বেতন পান না বলে জানিয়েছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়।
[প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি]