রাঙামাটি জেলা পরিষদের প্রকৌশল বিভাগের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আবু জাফর মো. এরশাদুল হক মণ্ডল। একসময়ের বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর জেলা শাখার সভাপতি এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ। জানা গেছে, জুলাই ’২৪ এর পর ভোল পাল্টান এরশাদুল। হয়ে ওঠেন বৈষম্যবিরোধী। বাগিয়ে নেন নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ। এখন তিনি বিএনপি-সমর্থক প্রকৌশলী। তাঁকে নিয়ে অতিষ্ঠ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছরের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে শত শত কোটি টাকার কাজ করে জেলা পরিষদের প্রকৌশল বিভাগ। তবে এসব টাকা কীভাবে ব্যয় হয়, তা জানে না তারা। নেই প্রকল্পের তদারকি। ইচ্ছেমতো কাজ করে প্রকৌশল বিভাগ। সূত্র আরও জানায়, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অবস্থা আরও খারাপ হয় পরিষদের। আর এ কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী এরশাদুল।
দুর্নীতিবাজদের তালিকায় নাম: দুদকের তালিকাভুক্ত দুর্নীতিবাজদের তালিকায় নাম আছে এরশাদুলের। তদন্ত চলাকালে তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস, ছেলে তাসনিমের নামে অবৈধ সম্পদের খোঁজে অনুসন্ধানে নামে দুদক।
এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী এরশাদুল প্রেষণে রাঙামাটি জেলা পরিষদে যোগ দেন ২০০৭ সালে। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে জেলা পরিষদ একের পর এক ব্যবস্থা নিলেও ঘুরেফিরে জেলা পরিষদে চলে আসেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কয়েকজনকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র বানিয়ে তাদের দিয়ে মব সৃষ্টি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পরিষদে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারে বসেন এরশাদুল। এরপর জেলা পরিষদ প্রকৌশল শাখা হয়ে ওঠে অনিয়ম দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য।
অভিযোগের পাহাড়: ঘুষের টাকা না দেওয়ায় সম্পন্ন হওয়া প্রকল্পের বিল আটকে দেওয়া, নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতাকে কাজ দিয়ে অন্যের ঠিকাদারি লাইসেন্স দিয়ে কাজ বাগিয়ে নেওয়া, বিভিন্ন ঠিকাদারের ফাইল অফিস থেকে গায়েব করা, মাদক গ্রহণ করে অফিসে আসা, বাড়িতে বসে অফিসের কার্যক্রম করা এবং সেনাবাহিনীর ভয় দেখিয়ে জেলা পরিষদের অন্যান্য কর্মকর্তাকে জিম্মি করার অভিযোগও রয়েছে এরশাদুলের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পরিষদের প্রথম শ্রেণির একজন ঠিকাদার বলেন, ‘এরশাদুল কাজ পাওয়ার আগে মোট টাকার ৫ শতাংশ অগ্রিম কেটে রাখেন। টাকা দেওয়ার পর কথা বলেন। সব কাজ তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। সাধারণ ঠিকাদারদের এরশাদ জিম্মি করেছেন। তাঁর কারণে গুণগত মানের কাজ করা যাচ্ছে না।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালে রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারে কমিউনিটি সেন্টারটির কাজ শুরু হয়। শুরুর সময় থেকে এরশাদুল ছিলেন তদারককারী প্রকৌশলী। এ পর্যন্ত ৬ কোটি টাকার বেশি খচর করা হলেও সেন্টারটি আলোর মুখ দেখেনি। পাওয়া যায়নি একজন সুবিধাভোগী। চলতি বছর এই প্রকল্পে অর্থ ছাড় হয়েছে ৩৬ লাখ টাকা। এই কাজ কবে শেষ হবে, তা জানা নেই।
শহরের তবলছড়ি আনন্দবিহার এলাকা-সংলগ্ন কাপ্তাই হ্রদের বুক চিরে নির্মাণাধীন তবলছড়ি ফ্রেন্ডস ক্লাবের কাজ আইনি নিষেধাজ্ঞায় ২০২১ সাল থেকে বন্ধ। অথচ ৫ কোটি ছাড় করেছে জেলা পরিষদ। কিন্তু এসব কিছুই জানে না ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
ঘুষ না দেওয়ায় রাঙামাটি শহরের রাঙ্গাপানির লুম্বিনী সড়ক ধারক দেয়াল সংস্কারের ২০ লাখ টাকার বিল আটকে রেখেছেন এরশাদুল।
এই কাজের ঠিকাদারের প্রতিনিধি সাইদুল ইসলাম বলেন, কাজ শেষ হয়েছে। চূড়ান্ত বিল ২০২৫ সালে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেগুলো এখনো দেয়নি। নানা অজুহাতে ফাইল গায়েব করে রেখেছেন এরশাদুল।
জেলা পরিষদের সদস্য মো. হাবীব আযম, বৈশালী রায়, প্রতুল চন্দ্র দেওয়ান বলেন, ‘এরশাদ আমাদের কোনো কথারই গুরুত্ব দেন না। সে নিজেকে চেয়ারম্যানের চেয়ে বড় ক্ষমতাশালী ভাবেন।’
লুম্বিনীর কাজের বিলের বিষয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, ‘আমি মনে করেছি, বিল দেওয়া হয়ে গেছে। এখন আপনার মাধ্যমে জানলাম, বিল দেওয়া হয়নি।’
মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম খন্দকার বলেন, ‘এরশাদুলকে পাওয়া যায় না। সে অফিসে আসে না। কথা শোনে না। ফাইল হারিয়ে গেলে নতুন করে ফাইল বানিয়ে দেওয়া হবে।’
সার্বিক বিষয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, ‘এরশাদুলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। সে সেনাবাহিনীর ভয় দেখায়।’