বর্ষার সকালে রাজশাহীর গ্রামজুড়ে এখন সোনালি আঁশের উৎসব। কোথাও পাট কাটা, কোথাও জলাশয়ে জাগ দেওয়া, আবার কোথাও উঠানে শুকানো হচ্ছে আঁশ। সেই ব্যস্ততার মধ্যেই কৃষকের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। কয়েক বছর ধরে দামের অনিশ্চয়তায় হতাশায় থাকা পাটচাষিরা এবার পাচ্ছেন আশাব্যঞ্জক বাজার। প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। ভালো ফলনের সঙ্গে এই দাম মেলায় লাভের মুখ দেখছেন কৃষকেরা। এতে আগামী মৌসুমে পাটের আবাদ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাষিরা বলছেন, রাজশাহীতে এবার পাটের দাম ভালো। রাজশাহীর নওহাটা হাটে এখন একের পর এক ভ্যান, ট্রলি আর ছোট ট্রাকভর্তি পাট এসে জমা হচ্ছে আড়তে। দরদাম চলছে, ওজন হচ্ছে, নগদ টাকাও হাতে পাচ্ছেন কৃষকেরা। কয়েক বছর আগেও যে বাজারে পাট বিক্রি করতে এসে অনেকের মুখে হতাশা দেখা যেত, এবার সেখানে স্বস্তির ছাপ স্পষ্ট।
শুক্রবার সকালে হাটে পাট বিক্রি করতে আসেন পবা উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামের কৃষক বাবলু আহমেদ। তিনি জানালেন, এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন তিনি। প্রতি বিঘায় প্রায় ১২ মণ করে উৎপাদন হয়েছে। ইতিমধ্যে ১২ মণ পাট বিক্রি করেছেন। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে চার মণ পাট প্রতি মণ সাড়ে চার হাজার টাকা দরে বিক্রি করে পেয়েছেন ১৮ হাজার টাকা। আগে আরও আট মণ পাট একই দামে বিক্রি করেছেন। সব হিসাব শেষে প্রতি বিঘায় প্রায় ২৫ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।
বাবলু আহমেদের ভাষায়, কয়েক বছর ধরে পাটের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও এবার সেই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কেটে গেছে। উৎপাদনও ভালো হয়েছে, দামও সন্তোষজনক। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে পাট আবাদ করবেন বলে ভাবছেন তিনি।
একই কথা বললেন বড়গাছির কৃষক আব্দুল আলীম। এক বিঘা জমিতে পাট চাষে তাঁর প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ১০ থেকে ১২ মণ। বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করলে খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তাঁর আশঙ্কা, মৌসুমের শেষ পর্যন্ত যদি এই দাম না থাকে, তাহলে লাভের হিসাবও বদলে যেতে পারে।
হাটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বাজার বেশ চাঙা। ব্যবসায়ী জানিপ হোসেন জানান, গত বছর মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট কিনতে হতো তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়। এবার একই সময়ে পাটের দাম চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। ভালো মানের পাটের চাহিদাও তুলনামূলক বেশি।
তবে এবারও পাট নিয়ে কৃষকের কিছু পুরোনো সমস্যা রয়ে গেছে। পাট কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষকদের দূরের জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে পাট জাগ দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, সময়ও বেশি লাগছে।
হরিপুর গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, পাট উৎপাদনের সবচেয়ে কষ্টের ধাপ হলো জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানো। পানি কম থাকলে পুরো প্রক্রিয়াটিই ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তারপরও এবার ভালো দাম পাওয়ার আশায় সেই অতিরিক্ত খরচ মেনে নিচ্ছেন কৃষকেরা।
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান বলেন, মৌসুমজুড়ে বর্তমান দামের ধারাবাহিকতা থাকলে কৃষকের লাভ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এতে আগামী বছর আরও বেশি কৃষক পাট চাষে আগ্রহী হতে পারেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে এক হাজার ৯৪ হেক্টর। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন, যা গত বছরের উৎপাদনের চেয়েও বেশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, মৌসুমের শুরুতে খরা ও ডিজেল সংকট পাট নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছিল। পরে সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। কৃষকের পরিচর্যাও ভালো ছিল। তাই ফলন আশানুরূপ হয়েছে। বাজারদরও এখন চাষিদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক।
পাট অধিদপ্তরের রাজশাহীর সহকারী পরিচালক নাদিম আক্তার জানান, চলতি বছর জেলায় সম্ভাব্য পাট উৎপাদন ধরা হয়েছে তিন লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল, যা গত বছরের তুলনায় ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি। বর্তমানে প্রতি মণ পাট চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কৃষকের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে বলে তিনিও মনে করেন।