পুকুরে কোমরসমান পানি। তাতেই ভাসছিল সাবিদুল ইসলামের (৩৪) মরদেহ। মাথায় রক্ত, চোখে-জিহ্বায় ক্ষত। শরীরের বিভিন্ন স্থানে পুড়ে যাওয়া ফোসকা। পুলিশ বলছে, বেসামাল নেশা করে পুকুরে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পরিবার এবং এলাকার লোকজন বলছেন ভিন্ন কথা।
তাঁদের মতে, নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে সাবিদুলকে। এই যুবকের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বিজয়নগর কলোনিতে। ২৬ জুলাই সকালে পার্শ্ববর্তী রাজাবাড়ীহাটের পুকুর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাবিদুলের মা আবেদা বেগম বলছেন, ধারের সামান্য কিছু টাকা ফেরত দিতে না পারায় নেওয়া হয়েছে ছেলের প্রাণ।
আজ শনিবার সকালে আবেদা বেগমের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। আবেদার দাবি, তাঁর ছেলে খুন হয়েছেন। প্রতিবেশীরাও একই কথা বলছেন। আবেদা অবশ্য অভিযুক্ত কারও নাম বলছেন না। অভিযুক্তরা কি প্রভাবশালী, নাম বলতে ভয় পাচ্ছেন—এমন প্রশ্নে আবেদা বললেন, ‘তাঁরা কোটিপতি’। আবেদা এত কিছু জানলেও পুলিশ রয়েছে অন্ধকারে।
নিহত সাবিদুলের বাবার নাম মো. কামাল। তাঁর তিন ছেলে। সাবিদুল মেজ। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী আর সাড়ে ৪ বছর বয়সী একটা মেয়ে আছে। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে ঢাকায় কাজ করতেন সাবিদুল। তিনি আগে থেকেই গাঁজা সেবন করতেন। ২৪ জুলাই মধ্যরাত থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ২৬ জুলাই সকালে পুকুরে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁর মরদেহ।
পরে প্রেমতলী তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায়। এ নিয়ে হত্যা মামলা হয়নি। একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছেন তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ রানা।
সাবিদুলের মা আবেদা জানান, মৃত্যুর আগের রাতে যখন সাবিদুল বাড়ি ফেরেন তখনো তাঁর মুখে কাদা লেগে ছিল। কারা যেন তাঁকে মেরেছিল! পরদিন ২৪ জুলাই সকালে সাবিদুল তাঁকে বলেছিলেন, ‘কেহু আমাকে মাইর্যা ফেললে লাশটা আইন্যা কবর দিস মা।’ সে দিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর আসেননি সাবিদুল। ২৬ জুলাই পাওয়া যায় মরদেহ।
আবেদা বেগম রাজাবাড়ীহাটে মানুষের কাছে হাত পেতে চলেন। তিনি জানান, রাজাবাড়ীহাটে গিয়ে তিনি জেনেছেন যে, ২৪ জুলাই গভীর রাতে তাঁর ছেলে রাজাবাড়ীহাট চেকপোস্টের পাশে আরিফের চায়ের দোকানে চা পান করেছেন। তারপর কয়েকজন তাঁকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যান। ওই রাতে তাঁকে নির্মম নির্যাতন করা হয় বলে তাঁর অভিযোগ।
ছেলের মরদেহের বর্ণনা দিয়ে কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা লাশ ভালো করে দেখেছি। চোখে পিন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মাথায়-কপালে রক্ত ছিল। জিহ্বা কেটে দেওয়া হয়েছিল। সারা শরীরে ফোসকাও ছিল। হয়ত মৃত্যুর আগে গরম পানি ঢালা হয়েছিল।’ পাশ থেকে আবেদা বেগম বললেন, ‘আমরা শুন্যাছি যে প্রথমে একদিন বাথরুমে লাশ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। একদিন পর পুকুরে ফেলা হয়। গরম পানি না ঢাললে এক দিনেই পানিতে থাকা লাশে ফোসকা পড়বে না। তাঁরা দুই-তিন হাজার টাকা পাইত, এ্যার লাইগা খুন।’
সাবিদুলের ময়নাতদন্তে কী পাওয়া গেছে তা জানতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. কফিল উদ্দিনকে ফোন করা হয়। তবে কাগজপত্র না দেখে তিনি কিছু বলতে পারবেন না বলে জানান।
অপমৃত্যুর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাসুদ রানা বলেন, ‘শরীরে ফোসকা আমরাও দেখেছি। সুরতহাল প্রতিবেদনে এটা লেখা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে মৃত্যু হয়েছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া বলতে পারছি না।’ তিনি বলেন, ‘পুকুরে যে পানি তাতে ডুবে মারা যাওয়ার কথা না।’
তবে পানিতে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মাকসুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ছেলেটা বেসামাল নেশা করত। যারা নেশা করে তাঁরা নেশা কাটাতে অনেক সময় পুকুরে নামে। হয়ত পুকুরে নেমে নেশার ঘোরে আর উঠতে পারেনি।’
মাকসুদুর বলেন, ‘সাবিদুল নিখোঁজের আগে মধ্যরাতে জনিসহ কয়েকজন ছেলের সঙ্গে আরিফের দোকানে চা পান করেছিলেন। তার পর থেকে তাঁকে আর কোথাও দেখা যায়নি।’
জনি দেওপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই টুনুর ছেলে। যোগাযোগ করা হলে তিনি সাবিদুলের সঙ্গে চা পানের কথা অস্বীকার করেন। তিনি তাঁকে চেনেন না বলেও দাবি করেন। পরে আরিফের দোকানের কথা বললে জনি বলেন, ‘সাবিদুল আমার সঙ্গে চা খায়নি। সে দূরে ছিল, আমি দেখেছি। আমার সঙ্গে পুলিশের এসআই জুয়েল আবেদীন ছিল। আমিসহ কয়েকজন এসআই জুয়েলের সঙ্গে চা খাই। তারপর চলে আসি।’
এসআই জুয়েল আবেদীনও জনির সঙ্গে চা পানের বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করেন। বলেন, ‘চা খেয়েছি সত্য, কিন্তু আমি কাউকে চিনি না।’ পরে বলেন, ‘শুধু জনিকেই চিনি।’
পরে এই প্রতিবেদককে ফোন করেন জনির ছোট ভাই আতিকুর রহমান টনি। তিনি তাঁর ভাইকে ফোন করার কারণ জানতে চান। কারণ জানালে তিনি বলেন, ‘সাবিদুলের মৃত্যুর রহস্য আমরাও জানতে চাই। তাঁর পরিবারকে আমরা সাহায্য করছি। আমরাই মিলাদ করালাম।’