রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ভয়াবহ বাসডুবির এক মাস পেরিয়ে গেছে। গত ২৫ মার্চ ওই দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ ২৬ জন মারা যান। এত বড় দুর্ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। তবে নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে দৌলতদিয়া ঘাটে দেখা যায়, সাতটি ফেরিঘাট পন্টুনের মধ্যে মাত্র একটি (৭ নম্বর ঘাট) পন্টুনে নিরাপত্তা রেলিং স্থাপন করা হয়েছে। বাকি ছয়টি এখনো রেলিংবিহীন ও অরক্ষিত। ফলে নিয়ন্ত্রণ হারানো যানবাহন পদ্মায় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আগের মতোই রয়ে গেছে। ঘাটে যাত্রী নামিয়ে ফাঁকা বাস ফেরিতে ওঠার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। ঘাটসংলগ্ন সড়কগুলোর অবস্থাও নাজুক। ঢালু, ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা এসব সড়কে ভারী যানবাহন ওঠানামার সময় প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা থাকে। দুর্ঘটনার পর কিছু স্থানে গর্ত ভরাট ও সমতল করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি। চালক ও শ্রমিকেরা বলছেন, বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আজিজ প্রামাণিক বলেন, দুর্ঘটনার পর অনেক আলোচনা হয়েছে, কর্মকর্তারা এসেছেন; কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রতিদিন একই ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চলাচল করছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সূত্রে জানা গেছে, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে প্রতিদিন গড়ে ১৮-২২টি ফেরি চলাচল করে। প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন এই পথে পারাপার হয়, যার মধ্যে বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যাই বেশি।
দূরপাল্লার বাসচালক শহীদ আলী বলেন, ‘এই ঘাটে গাড়ি চালানো মানে জীবন হাতে নিয়ে নামা। পন্টুনে ওঠানামার সময় রাস্তার অবস্থার কারণে ব্রেক নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে যায়। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
একই চিত্র দেখা গেছে পাটুরিয়া ঘাটেও। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌরুটে প্রতিদিন হাজারো যানবাহন পারাপার হলেও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি স্পষ্ট। পন্টুনে ওঠানামার সময় সড়কের উচ্চতার তারতম্য, ভাঙাচোরা অংশ ও শৃঙ্খলার অভাবে ঝুঁকি বাড়ছে। নির্ধারিত নিয়মে সারিবদ্ধভাবে যানবাহন ওঠার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না, ফলে তাড়াহুড়ো ও বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। প্রাইভেট কার চালক মো. বাবুল বলেন, ‘ঘাটে ঢুকলেই চাপ আর বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। দুর্ঘটনার পরও বড় কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি।’
রাজবাড়ী থেকে ঢাকাগামী যাত্রী মোজাম্মেল হক বলেন, এত বড় দুর্ঘটনার পরও যদি কিছু না বদলায়, তাহলে দায় কার?
তদন্ত হয়েছে, বাস্তবায়ন নেই
দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তাদের প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, বিষয়টি মূলত বিআইডব্লিউটিসির অধীনে। তবে কিছু উন্নয়নকাজ প্রক্রিয়াধীন।
বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য পন্টুনে ধাপে ধাপে রেলিং স্থাপন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৭ নম্বর ঘাটে কাজ শেষ হয়েছে, অন্য পন্টুনগুলোতেও কাজ চলছে। যাত্রীদের নিয়ম মেনে চলার বিষয়েও সচেতন হতে হবে।