প্রকল্পের নাম ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশু যত্ন কেন্দ্র’ (আইসিবিসি)। নীলফামারীর তিন উপজেলার এ প্রকল্পে উঠেছে এন্তার দুর্নীতির অভিযোগ। এসব দিবা যত্ন কেন্দ্রে বিনা মূল্যে শিশুদের রাখার কথা থাকলেও অভিভাবকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে টাকা। প্রতিটি কেন্দ্রে ২৫টি শিশু থাকার কথা থাকলেও কোথাও কোথাও ৫-৬টি শিশু পাওয়া গেছে। কেয়ারগিভারের চাকরি দেওয়া হয়েছিল ঘুষের বিনিময়ে। প্রকল্প শেষ হলেও তাঁরা বেতন পাননি। নারী কর্মীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে এনজিও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
এই প্রকল্পের আওতায় ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ এবং ৬-১০ বছর বয়সীদের সাঁতার শেখানোর কথা। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটির আওতায় কিশোরগঞ্জ, ডিমলা ও সৈয়দপুর উপজেলায় ৫০০টি ডে-কেয়ার সেন্টার ও ৫০টি সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল কাগজে-কলমে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে চার বছরে বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৫ কোটি টাকা। এই প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব পায় ‘লোকাল আইডিয়া ফর এমপাওয়ারমেন্ট-লাইফ’ নামের একটি এনজিও। সূত্র জানিয়েছে, এই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ আবারও শুরু হবে।
নিয়োগে ঘুষ ও বেতনের টাকা আত্মসাৎ: এনজিও ‘লাইফ’-এর বিরুদ্ধে শিশুযত্নকারী (কেয়ারগিভার) ও সহকারী হিসেবে স্থানীয় নারীদের নিয়োগ দেওয়ার নামে ১৫-৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘুষ দিয়ে চাকরি নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ডিমলা, কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর উপজেলার কেয়ারগিভার শারমিন আক্তার, মরিয়ম বেগম, সুরভী আক্তারসহ অন্তত ৩০ জন।
ডিমলা উপজেলার শালহাটি কেন্দ্রের কেয়ারগিভার মনিরা অভিযোগ করেন, নিয়োগের সময় তাঁদের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়। বকেয়া রাখা হয়েছে ৫-৬ মাসের বেতন।
একইভাবে সাঁতার প্রশিক্ষকদের জন্য ছয় মাসের বাজেট থাকলেও দেওয়া হয়েছে মাত্র তিন মাসের টাকা।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে ২৫ জন শিশু থাকার কথা থাকলেও সরেজমিনে অধিকাংশ কেন্দ্রে মাত্র ৫-৬টি শিশুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ডিমলা উপজেলার হাজীপাড়া, দক্ষিণ সুন্দরখাতা ও উত্তর আকাশকুড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাত্র ২০০ মিটারের ব্যবধানেই গড়ে তোলা হয়েছে ২-৩টি শিশু যত্ন কেন্দ্র। কাগজপত্রে ২৫ জন করে শিশুর নাম থাকলেও এসব কেন্দ্রের প্রতিটিতে বাস্তবে ছিল মাত্র ৫-৬টি শিশু।
শিশু রাখতে টাকা, যৌন হয়রানি: এসব দিবা যত্ন কেন্দ্রে বিনা মূল্যে সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিটি শিশুর কাছ থেকে ২০০-২৫০ টাকা ভর্তি ফি আদায় করা হয়েছে। ডিমলা উপজেলার শালহাটি কেন্দ্রের কেয়ারগিভার আনজুয়ারা ও কালীগঞ্জ কেন্দ্রের মনিরা বেগম বলেন, এনজিও কর্মকর্তাদের নির্দেশেই তাঁরা এই টাকা তুলেছিলেন। এই টাকা কর্মকর্তারা নিয়েছেন।
আর্থিক দুর্নীতির পাশাপাশি লাইফ এনজিওর প্রকল্প কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে নারী কর্মীদের মানসিক ও যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। সৈয়দপুরের শাহিনা বেগম নামের এক কর্মী অভিযোগ করেন, সুভাষ চন্দ্রের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ৯ মাসের বকেয়া বেতন পাননি।
তবে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত সুভাষ চন্দ্র।
এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও। ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুজ্জামান সরকার বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে কাগজে-কলমে কেন্দ্র দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো কার্যক্রম ছিল না।’
একই কথা বলেছেন সৈয়দপুরের কামারপুকুর ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন।
রহস্যজনক ‘সন্তোষজনক’ প্রত্যয়ন: এত অভিযোগ থাকার পরও এসব দিবা যত্ন কেন্দ্র ও সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে সন্তোষজনক প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে। নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের ৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের তৎকালীন ইউএনও প্রীতম সাহা বদলি হন। এরপর চার কর্মদিবসের জন্য ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) তনিমা জামান। ১১ ডিসেম্বর সেখানে নতুন নিয়মিত ইউএনও যোগ দেন। তবে নতুন ইউএনও দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও ১৪ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে তনিমা জামান প্রকল্পের কার্যক্রমে ‘সন্তোষজনক’ প্রত্যয়নপত্র দেন। মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় এ বিষয়ে তনিমা জামানের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে কিশোরগঞ্জের বর্তমান ইউএনও আরিফুর রহমান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত কর্মকর্তা যোগ দেওয়ার পর আর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর করার সুযোগ নেই।
যদিও সৈয়দপুর উপজেলার তৎকালীন ইউএনও নূর-ই-আলমের তদন্তে ‘লাইফ’ এনজিওর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক সত্যতা মেলে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাঠপর্যায়ে কেন্দ্র ও সাঁতার প্রশিক্ষণের দৃশ্যমান কার্যক্রম ছাড়াই সরকারি অর্থ তছরুপ করা হচ্ছে। এই প্রকল্প নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের ডিসেম্বরে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নাযিরুজ্জামান একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তবে দীর্ঘ ছয় মাস পার হয়ে গেলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাদুল মিয়া এবং জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদ। এই প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, মাদুল মিয়া এক মাঠকর্মীকে বলছেন, ‘পলিটিক্যাল সাপোর্ট থাকলেই হয়ে গেল...সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জের কর্মীদের কাজ করেনি বলে বেতন আটকায় দেন। সেখান থেকে ৬ লাখ টাকার মধ্যে আপনি এক লাখ নেন, বাকি পাঁচ লাখ টাকা আমার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেন।’