• তরুণদের এই গ্রুপ এলাকায় পরিচিত ‘চাটা গ্রুপ’ নামে
• তরুণ গ্রুপকে শাকিল হত্যায় ব্যবহারের অভিযোগ এমপিপুত্র মিন্টুর বিরুদ্ধে
• গ্রুপটির পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যবসায়ী রাসেল
• শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর কারাগারে তরুণ গ্রুপের দুই সদস্য
নাটোরের গুরুদাসপুরে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম (৩২) হত্যাকাণ্ডে আলোচনায় এসেছে স্থানীয় তরুণদের একটি গ্রুপের নাম। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাকিলকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) আব্দুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু ব্যবহার করেছিলেন এই গ্রুপকে। আর এর পেছনে অর্থের জোগান দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যবসায়ী রাসেল হোসাইন। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাসেল।
শুধু শাকিল হত্যাকাণ্ড নয়, গুরুদাসপুরের রাজনীতি, মাদক কারবার ও স্থানীয় ক্ষমতার বলয় ঘিরেও সামনে আসছে স্থানীয় তরুণদের এই গ্রুপের নাম, যারা এলাকায় পরিচিত ‘চাটা গ্রুপ’ নামে।
গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের কচুগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা রাসেল হোসাইন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় ব্যবসা করেন। গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় বাজারে তাঁর একটি শপিংমল আছে। এখানে ‘রাস আরবান স্টাইল’ নামে রাসেলের লাইফস্টাইল শোরুম রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যবসায়ী রাসেল হোসাইনের অনুসারীদেরই এলাকায় ‘চাটা’ বলে কটূক্তি করা হতো। শুরুতে রোকন নামের এক তরুণকে ‘রাসেলের চাটা’ বলে ডাকা হতো। সময়ের সঙ্গে রাসেলের ঘনিষ্ঠ তরুণের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এখন এদের একসঙ্গে ‘চাটা গ্রুপ’-এর সদস্য বলা হয়।
রাসেল হোসাইনের দাবি, এলাকার তরুণদের বিপদে-আপদে তিনি পাশে দাঁড়ান। দেশে এলে তাঁদের নিয়ে ঘোরাফেরা করেন, তাঁদের পেছনে অর্থ ব্যয় করেন। তাঁর সঙ্গে চলাফেরা করা তরুণদেরই চাটা গ্রুপের সদস্য বলা হয়। তবে এটি কোনো বাহিনী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নয় বলে দাবি তাঁর।
নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলমের ভাষ্য, রাসেল বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে অর্থ দিয়ে থাকেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি তৎকালীন সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুসকে অর্থ দিতেন। বর্তমানেও যাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন, তাঁদের অর্থ দেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির লোকজন রাসেলের বাড়ি ঘিরে ফেলেছিলেন। তখন তাঁদের নিবৃত্ত করেন এমপিপুত্র মিন্টু। সেই থেকে রাসেলের সঙ্গে মিন্টুর ঘনিষ্ঠতা। একপর্যায়ে মিন্টু চাটা গ্রুপের সদস্যদেরও কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন।
তবে রাসেলের দাবি, মিন্টুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল না। দেশে থাকা বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার জন্য তাঁকে সম্পর্ক রাখতে হয়েছে। মিন্টু কয়েক দফায় চেকের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে চাঁদা নিয়েছেন।
রাসেল আরও দাবি করেন, সংসদ সদস্য নির্বাচনের সময় মিন্টুর বাবা আব্দুল আজিজও তাঁর কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচনে আব্দুল আজিজের পেছনে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে এমপি আব্দুল আজিজের ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি। তাঁর ছেলে মিন্টু ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যা মামলায় কারাগারে থাকায় তাঁর বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
শাকিল হত্যাকাণ্ডের তদন্তসংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তার দাবি, মিন্টু এলাকায় মাদক কারবারের একটি সিন্ডিকেট (চক্র) নিয়ন্ত্রণ করতেন। মাদকসংক্রান্ত বিষয়েই শাকিলের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এমপিপুত্র মিন্টু। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, শাকিলকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করেছিলেন মিন্টু। আর তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় তরুণদের গ্রুপকে। সে জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেন গ্রুপটির পৃষ্ঠপোষক
হিসেবে পরিচিত রাসেল হোসাইন।
এ জন্য শাকিলের মরদেহের দাফন শেষে বিক্ষুব্ধরা রাসেল হোসাইনের রাস আরবান স্টাইল শোরুমে হামলা চালান। তবে শাকিল হত্যায় তরুণদের গ্রুপের জড়িত থাকার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন রাসেল। তাঁর দাবি, শাকিলকে তিনি ছোটবেলা থেকেই চিনতেন। ১৭ বছর ধরে তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। শাকিলের সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতা ছিল না। এমপি ও তাঁর ছেলের ওপর থেকে দৃষ্টি সরাতেই হত্যাকাণ্ডে তাঁদের জড়ানো হচ্ছে।
তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে এখনই সবকিছু খোলসা করা যাচ্ছে না। তবে আমরা কাউকে অহেতুক হয়রানিও করছি না। চুলচেরা বিশ্লেষণ করে পুলিশ সামনে এগোচ্ছে। যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে, তাদেরই কেবল আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’
শাকিলের ওপর হামলার পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকেও তরুণদের গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। নিহতের বাবা রবিউল করিমের দাবি, মৃত্যুর আগে শাকিল জানিয়েছিলেন, ইরফান নেওয়াজ ও মো. হাবিব নামের দুই তরুণ তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছিলেন। তাঁদের বাড়ি গুরুদাসপুরে। এলাকায় এরা চাটা গ্রুপের সদস্য হিসেবে পরিচিত। শাকিলের মৃত্যুর পর থেকে তাঁরা আত্মগোপনে।
এর মধ্যেই শাকিল হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গত বৃহস্পতিবার রাতে আনিসুর রহমান ও আল-আমিন নামের আরও দুই তরুণকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় নাটোর জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তাঁরাও ওই গ্রুপের সদস্য হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। শনিবার তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।
নাটোর জেলা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আল-আমিন ও আনিসুর রহমানকে শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ (শনিবার) আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আদালতে তাঁদের রিমান্ডের আবেদন করা হবে।’ তিনি নিশ্চিত করেন, এরা চাটা গ্রুপের সদস্য। তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত জানাতে চাননি তিনি।
ডিবির পরিদর্শক নজরুলের ভাষ্য, শাকিলের বাবা ইতিমধ্যে ওই গ্রুপের দুজন সন্দেহভাজনের নাম প্রকাশ করে দেওয়ায় তদন্তে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেও তাঁদের নাগাল পাচ্ছেন না।
শাকিল হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার নুরুজ্জামান মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড শেষ হয় শুক্রবার। তবে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন বলে মনে করছে ডিবি পুলিশ। এ জন্য শুক্রবার বিকেলে তাঁকে আদালতে হাজির করে আরও সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। তবে শনিবার পর্যন্ত রিমান্ড আবেদনের শুনানি হয়নি।
ডিবির পরিদর্শক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রিমান্ডের শুনানির দিন এখনো ঠিক হয়নি। আবার মিন্টুর রিমান্ড পেলে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
উল্লেখ্য, গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম গত ১৪ অক্টোবর রাতে হামলার শিকার হন। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ অক্টোবর রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। সেদিন ছাত্রদল নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের এমপি আব্দুল আজিজকে অবরুদ্ধ করে। পরে বাবার পরামর্শে থানায় আত্মসমর্পণ করেন মিন্টু।