দেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁ। জেলার বিভিন্ন বাগানে গাছে গাছে ঝুলছে পাকা-কাঁচা আম। চলছে আম সংগ্রহ, বাছাই ও বাজারজাতকরণের ব্যস্ততা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চাষি ও ব্যবসায়ীদের পদচারণে মুখর দেশের অন্যতম বৃহৎ আমের মোকাম সাপাহার। তবে এই ব্যস্ততার মাঝেও চাষিদের মুখে নেই স্বস্তির হাসি। কারণ, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় সব ধরনের আমের দাম কম। অন্যদিকে বাজারে প্রচলিত ৪০ কেজির এক মণের পরিবর্তে ৫২ থেকে ৫৫ কেজিকে এক মণ ধরে চাষিদের কাছ থেকে আম কিনছেন আড়তদারেরা।
চাষিদের দাবি, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু আমের বাজারদর কম থাকায় লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত ওজনে আম বিক্রির চাপ। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘ঢলন’ পদ্ধতির কারণে প্রতি মণে অতিরিক্ত ওজন দিতে হচ্ছে, যা তাঁদের লাভের বড় অংশ কেড়ে নিচ্ছে। প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ওজনে আম বিক্রি করতে হচ্ছে, যা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ২৩৫ টন।
সাপাহার আমের মোকামে গিয়ে দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যান ও শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যানবাহনে ক্যারেটভর্তি আম্রপালি, বারি-৪, ব্যানানা ম্যাঙ্গোসহ বিভিন্ন জাতের আম নিয়ে আসছেন চাষিরা। উপজেলা সদরের জিরোপয়েন্ট-গোডাউনপাড়া, জিরোপয়েন্ট-তিলনা, জিরোপয়েন্ট-হাসপাতাল মোড় ও জিরোপয়েন্ট-থানা মোড় সড়কজুড়ে কয়েক কিলোমিটার এলাকায় বসেছে আমের বাজার। তবে আমের দাম ও ওজন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন চাষিরা।
আমচাষি তারেক বলেন, ‘এবার আমের আশানুরূপ দাম নেই। বাগান পরিচর্যা, শ্রমিক, সার ও কীটনাশকের খরচ বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় সব ধরনের আমের দাম প্রতি মণে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা কম। এর ওপর ব্যবসায়ীরা প্রতি মণে প্রায় ১৪ কেজি বেশি আম নিচ্ছেন। এতে কৃষকের হাতে তেমন কিছুই থাকে না। প্রশাসন বিষয়টি দেখলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন।’
আরেক চাষি আব্দুর রহমান বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে আমের মণের ওজন বাড়ছে। আগে ৪৪ কেজি নেওয়া হলেও এখন ৫২ থেকে ৫৫ কেজি নেওয়া হচ্ছে। বাজার সিন্ডিকেটের কারণে আড়তদারেরা এই নিয়ম চাপিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন অজুহাতে আরও তিন-চার কেজি বেশি দিতে হয়। ফলে ১৩ মণ আম বিক্রি করলেও ১০ মণের দাম পাওয়া যায়। উৎপাদন খরচই তুলতে পারব কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছি।’
আমচাষি মেহেদী হাসান বলেন, ‘কৃষকেরা নিরুপায়। সকালে এক দাম, বিকেলে আরেক দামে আম কেনেন আড়তদারেরা। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় এবং আম দ্রুত নষ্ট হওয়ায় আড়তদারেরা যে দাম বলেন, সেই দামেই বিক্রি করতে হয়। কৃষক ছাড়া সবাই লাভবান হচ্ছে।’
সাপাহার আম ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত বলেন, ‘রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন মোকামে প্রতি মণে ৫৪ থেকে ৫৬ কেজি হিসেবে আম কেনাবেচা হয়। তবে সাপাহার মোকামে ক্যারেটসহ ৫০ কেজি হিসেবে আম কেনা হচ্ছে। কোথাও অনিয়মের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশপাশের মোকামের তুলনায় এখানে ওজনের বিষয়টি সহনশীল।’
এ বিষয়ে সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা রিয়াজ বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। কেউ অভিযোগ করলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করা হবে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন কাজ করছে।’