ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক ছয় লেন প্রকল্পের কাজে। যানবাহনের চাপে সরু এই মহাসড়কের মাদারীপুর অংশের ৪৭ কিলোমিটার এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। তবুও ঝুঁকি নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করছে। একদিকে সরু সড়ক, অন্যদিকে ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, মাহিন্দ্রা, নসিমন চলাচল করায় দুর্ঘটনাও বেড়েছে অনেক। সব মিলিয়ে এই সড়ক দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত ছয় লেন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। সরকারের এককভাবে এ অর্থ জোগান দেওয়া কঠিন হওয়ায় বিদেশি দাতা সংস্থার সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু এখনো কোনো দাতা সংস্থা এগিয়ে না আসায় প্রকল্পটি স্থবির হয়ে আছে। তবে ২৪ ফুট থেকে ৩২ ফুটে সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলমান থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে সেটিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে ভাঙ্গা-মাদারীপুর-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক সম্প্রসারণের প্রস্তাব নেওয়া হয়। একই বছর ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়। ২০২৩ সালে মাদারীপুর অংশের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ২৫৮ কোটি টাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়। অথচ দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
সূত্র আরও জানায়, ২০১৯ সালে এই মহাসড়কে প্রতিদিন প্রায় ১৯ হাজার যানবাহন চলাচল করত। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ থেকে ৩২ হাজারে। অথচ মাদারীপুরের ৪৭ কিলোমিটার অংশের সড়কের প্রস্থ মাত্র ২৪ ফুট; যেখানে ফরিদপুর ও বরিশাল অংশে রয়েছে ৩২।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের যাতায়াত বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু সরু সড়ক ও অব্যবস্থাপনার কারণে মহাসড়কে দুর্ঘটনা লেগেই থাকে। তা ছাড়া দেশের সব মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে উচ্চ আদালত। অথচ ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুরের ৪৭ কিলোমিটার অংশে প্রতিদিনই চলছে ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, মাহিন্দ্রা, নসিমন। এতে করেও বাড়ছে দুর্ঘটনা। প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ।
চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি মহাসড়কটির মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটকচরে যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইজিবাইককে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান সাতজন। এর এক সপ্তাহ আগে ১৩ জানুয়ারি তাঁতিবাড়ি এলাকায় কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় দুই নারীসহ ভ্যানের তিন যাত্রী নিহত হন। গত পাঁচ মাসে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুর অংশে কমপক্ষে ৩০টি স্থানে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৩৫ জন। আহত হয়েছে অর্ধশত।
ঢাকা থেকে মাদারীপুরে আসা ওহিদুজ্জামান খান বলেন, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক দুই লেন থেকে ছয় লেনে উন্নীতকরণের দাবি দীর্ঘদিনের। এই প্রত্যাশা পূরণ হলে মহাসড়কে দুর্ঘটনার হার অনেকাংশে কমে আসবে। তা না হলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় মানুষ প্রাণ হারাবে।
আরেক যাত্রী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘এই মহাসড়কের বরিশাল ও ফরিদপুরের তুলনায় মাদারীপুর অংশের সড়কটি খুবই সরু। তা ছাড়া অনেক জায়গায় সড়কের পাশে মাটি না থাকায় যান চলাচলে সমস্যা হয়। দ্রুতগতির পরিবহন সাইড দিতে গিয়েও সমস্যায় পড়তে হয়।’
মাদারীপুরের মোস্তফাপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুন আল রশিদ বলেন, মহাসড়কে নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে। যাত্রী ও চালকদের সচেতনও করা হচ্ছে। এ ছাড়া অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে কয়েক ভাগ হয়ে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে আর্থিক জরিমানাও আদায় করছে।
মাদারীপুর সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মুন্সি মাসুদুর রহমান বলেন, ‘সড়ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জেলা প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে টেকেরহাট থেকে ছয় কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি অংশ করা হবে। তবে ছয় লেন প্রকল্প কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় আমি বলতে পারব না।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ) জুয়েল আহমেদ বলেন, ঢাকা-বরিশাল সড়ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে করে এই সড়কের দুর্ঘটনা কমে আসবে।