মেয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে যুক্তরাষ্ট্রে গেছে! পিএইচডি করছে, পরিশ্রম হচ্ছে বেশ, দৈনন্দিন জীবনযাপন, নতুন নতুন অভিজ্ঞতার কথাই ভীষণ গর্ব ভরে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে গল্প করতেন বাবা। আজ প্রতিবেশী-স্বজনেরা বাড়িতে ভিড় করেছেন। অথচ সেই মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা বলছেন, ‘আমার মেয়ে আর বেঁচে নেই, নিশ্চিত হয়েছি। সব শেষ! এখন মেয়ের লাশটা অন্তত পেতে চাই। দোষীদের যেন শাস্তি হয়।’
মেয়েটির নাম নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। তাঁর বাবার নাম জহির উদ্দিন আকন। তাঁরা মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুরের এটিএম বাজার এলাকার বাসিন্দা। আজ শনিবার পরিবারের সদস্য, পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন এসেছেন ওই বাড়িতে। সবাই শোকার্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করতে যাওয়া নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে। তবে মৃত্যু নিশ্চিত হলেও তাঁর মরদেহ এখনো খুঁজে পায়নি সেখানকার প্রশাসন।
বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন বলেন, ‘২০২৫ সালের ১২ আগস্ট উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যায় বৃষ্টি। সর্বশেষ ১৬ এপ্রিল বৃষ্টির সঙ্গে আমাদের কথা হয়। এর পর থেকে সে নিখোঁজ। পরে আমরা বৃষ্টি ও তার সহপাঠীর মৃত্যুর খবর পাই।’
পরিবার সূত্রে জানা যায়, জহির উদ্দিন আকন বহু বছর ধরে ঢাকার মিরপুরে থাকতেন। মিড লাইফ ইনস্যুরেন্সের ম্যানেজার পদে চাকরি করতেন তিনি। তাঁর দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে বৃষ্টি ছোট, বড় ছেলে জাহিদ হাসান ইঞ্জিনিয়ার। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ঈদুল আজহার সময় সবাই গ্রামের বাড়িতে আসতেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন বৃষ্টি।
শনিবার সকালে সরেজমিনে গোবিন্দপুরের বাড়িতে দেখা যায় শোকার্ত আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর ভিড়। তাঁরা কেউই এলাকার অনুপ্রেরণা মেধাবী বৃষ্টির এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না। একে অপরকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। তবে তাঁরা এখন দ্রুত বৃষ্টির মরদেহ খুঁজে দেশে আনা এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।
নাহিদার চাচাতো বোন তুলি আকন বলেন, ‘বৃষ্টি আপু অনেক মেধাবী ছিলেন। সকালে জাহিদ ভাইয়া (বৃষ্টির বড় ভাই) তাঁর ফেসবুকে আপু মারা যাওয়া নিয়ে পোস্ট দেন। সেটা দেখেই আমরা প্রথমে জানতে পারি।’
আরেক চাচাতো বোন ফজিলা আক্তার বলেন, ‘আমরা কিছুতেই এই মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে!’
নাহিদার চাচা দানিয়াল আকন বলেন, ‘বৃষ্টি অনেক মেধাবী ছিল। সে এলাকার অনেক ছেলেমেয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে ছিল। সে দেশের জন্য ভালো কিছু করতে পারত। কিন্তু তাকে হত্যা করা হবে ভাবতেও পারছি না।’
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ‘আমি বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, বৃষ্টি নামে মাদারীপুরের এক শিক্ষার্থী আমেরিকায় মারা গেছেন। এ ক্ষেত্রে মূল কাজ করবে দূতাবাস। আমার কাছে তাঁর পরিবার যদি কোনো সহযোগিতা চায়, আমি সেটা করব। দূতাবাস যদি স্থানীয় কোনো তথ্য চায়, সেটাও দিতে পারব।’
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনকেও হত্যা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করেছে দেশটির প্রশাসন। তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলে জানা গেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টির সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁদের এক পারিবারিক বন্ধু পরদিন ১৭ এপ্রিল বিকেলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুটি নিখোঁজ ডায়েরি করা হয় এবং অঙ্গরাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ের নিখোঁজ ব্যক্তির ডেটাবেইসে দুজনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়।