মাথার ওপর মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি, আর নিচে মুসল্লিদের জনসমুদ্র। সেই মেঘ-বৃষ্টির ভ্রুকুটি উপেক্ষা করেই কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে আজ শনিবার অনুষ্ঠিত হলো ঈদুল ফিতরের ১৯৯তম জামাত। লাখো কণ্ঠের ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি আর দুই হাত তুলে মোনাজাতের মধ্য দিয়ে নরসুন্দা নদীর তীরে তৈরি হয় এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকেই ৭ একর আয়তনের শোলাকিয়া মাঠ পূর্ণ হয়ে যায়। দূরদূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে নরসুন্দা নদীর তীরের এই বিশাল প্রান্তর।
নির্ধারিত সময় সকাল ১০টায় জামাত শুরু হয়। ১৭৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঈদগাহের ঐতিহ্য অনুসারে জামাত শুরুর আগে তিনবার তোপধ্বনি (ফাঁকা গুলি) ছুড়ে মুসল্লিদের সংকেত দেওয়া হয়। মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে কিছুটা গুমোট ভাব থাকলেও মুসল্লিদের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি। নামাজ পড়তে আসা দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লিতে জনসমুদ্রে পরিণত হয় শোলাকিয়া ময়দান। আগত মুসল্লিদের অনেকে মাঠে জায়গা না পেয়ে পার্শ্ববর্তী রাস্তা, বাড়ির ছাদ, নদীর তীর ও শোলাকিয়া সেতুতে জামাতের জন্য দাঁড়িয়ে পড়েন।
এবারের জামাতে ইমামতি করেন মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ। নামাজ শেষে খুতবা পাঠ এবং পরে মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও দেশ-জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
নিরাপত্তার স্বার্থে সকাল ৭টার আগে মুসল্লিদের ঈদগাহে প্রবেশ করতে দেয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সকাল ৭টার দিকে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে প্রত্যেক মুসল্লিকে তল্লাশি করে ঈদগাহে ঢুকতে দেয়। এবারও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ছিল সর্বোচ্চ কড়াকড়ি। পুলিশ, র্যাব ও আনসারের পাশাপাশি মাঠে মোতায়েন ছিল ৫ প্লাটুন বিজিবি। পুরো মাঠ ও আশপাশের এলাকা নজরদারিতে রাখা হয়েছিল ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ৬টি ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে।
নিরাপত্তা বাহিনীর ড্রোন ক্যামেরা আকাশে উড়ে মাঠের পরিস্থিতি তদারকি করা হয়। মুসল্লিদের চার স্তরের তল্লাশি পেরিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে হয়। ছাতা, ব্যাগ বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহন করার ওপর ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
নামাজ পড়তে আসা মুসল্লি নেত্রকোনা খালিয়াজুড়ি উপজেলার জাহেরপুর গ্রামের মিরাজ আলী (৭৭) বলেন, ‘ছয় বছর আগে জামাতে নামাজ আদায় করছি। আগে খাবারের ব্যবস্থা থাকত। এখন থাকে না।’
ময়মনসিংহ হালুয়াঘাট কলিম মাহমুদ খান (৮৫) বলেন, ‘ছয় বছর বয়সে বড় ভাইয়ের সঙ্গে আসছিলাম। তখন আমরা হোসেনপুর থাকতাম। আর এখন ৮৫ বছর বয়সে আসলাম আবার বড় জামাতে নামাজ আদায় করতে।’
নামাজ পড়তে আসা মুসল্লি শেখ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া। ছোটবেলা থেকেই রেডিও আর বিটিভিতে শোলাকিয়ার এই বিশাল ঈদ জামাতের কথা শুনতাম। তখন থেকেই মনে মনে স্বপ্ন বুনেছিলাম, জীবনে একবার হলেও এখানে নামাজ পড়ব। অনেকবার চেষ্টাও করেছি, কিন্তু আসা হয়ে ওঠেনি। আজ ৩০ বছর পর আমার সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। এই বিশাল জনসমুদ্রে শরিক হতে পেরে যে আনন্দ হচ্ছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সম্মানিত মুসল্লিরা ঈদের জামাতে অংশ নেন।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, ‘পর্যাপ্তসংখ্যক সেনাবাহিনীর সদস্য, র্যাব সদস্য ও পাঁচ প্লাটুন বিজিবি সদস্য এবং এপিবিএন মোতায়েন ছিল। এ ছাড়া আনসার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন। ছিল ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট। দায়িত্ব পালন করেছেন ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। গোয়েন্দা নজরদারি ছিল।’
মুসল্লিদের ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম বলেন, শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান কিশোরগঞ্জবাসীর মানুষের গর্ব। শুধু বাংলাদেশে নয়, বহির্বিশ্বেও মুসলমানদের কাছে এই মাঠের পরিচিতি রয়েছে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, ‘ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ, এটা কিশোরগঞ্জের একটি ইতিহাস-ঐতিহ্য। আমাদের গর্বের ব্যাপার। এই মাঠকে দিয়েই কিশোরগঞ্জের পরিচিতি।’