খাগড়াছড়িতে দিন দিন বিদেশি জাতের আমের চাষ বাড়ছে। বিভিন্ন জাতের রঙিন আমে পাহাড়ের কোল ভরে উঠছে। কৃষকেরা বলছেন, পাহাড়ের অনুকূল আবহাওয়া-জলবায়ু এবং উর্বর মাটির কারণে বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ করে সফল হচ্ছেন তাঁরা। দেশীয় জাতের আমের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দাম পাওয়ার কারণে বিদেশি জাতের আম চাষে আগ্রহ বাড়ছে তাঁদের। আম বিপণনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টোল আদায় বন্ধের দাবি জানিয়েছেন বাগানমালিকেরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে খাগড়াছড়িতে ৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে দেশি ও বিদেশি জাতের আমের চাষ হয়েছে।
যেসব রঙিন আমের আবাদ হচ্ছে, সেগুলো হলো ব্লাক স্টোন, মিয়াজাকি, কিউজাই, নাম ডক মাই, হানিভিউ, রেড পালমার, ইতালিয়ান অস্টিন, ব্যানানা, আমেরিকান পারমাল, আমেরিকান কেইন, আর টু ইটু, রেড এমপেরর, রেড আইভেরি, আমেরিকান কেন্ট, কেইট, মহাচনক, কেশর, পুসা, পুসা সুরিয়া, অরুণিমা, পুসা অরুনিমা, তোতাপুরী, কাটিমন, কারাবাও, অস্ট্রেলিয়ান কেনসিংটন প্রাইড, টমি অ্যাটকিন্স, আলফানসো, বেইলির মার্ভেল, থ্রি টেস্ট, মায়া, থাই কাঁচা মিঠা, ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড ফ্লোরিডার, অস্টিন গোল।
সদর উপজেলার ২নং কমলছড়ি নতুনপাড়া এলাকার কৃষক মংশিতু চৌধুরী জানান, তাঁর বাগানে ৫৪টি রঙিন জাতের মধ্যে ৪০টি জাতে কয়েক বছর ধরে ফলন আসছে। ৩০ একরের বেশি জমিতে প্রায় ৪ হাজার গাছ আছে। এর মধ্যে বিদেশি ব্লাক স্টোন, কিউজাই, নাম ডক মাই, মিয়াজাকি, আমেরিকান পালমার, ব্যানানা ম্যাংগো, থাইল্যান্ডের চিয়াংমাই, কিউজাই, রেড লেডি, আপেল ম্যাংগো, দোকমাই ও কেসিংটন প্রাইডসহ বিভিন্ন জাতের আম রয়েছে। প্রায় গাছে ভালো ফলন হয়েছে। এই বছর ২০ টন ফল পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।
মংশিতু বলেন, ‘বিদেশে রপ্তানি করার জন্য আম চাষ করতেছি। এই বছর আমি বিদেশে রপ্তানির জন্য ল্যাবে আবেদন করেছি। যদি সার্টিফিকেট পাই, তাহলে আগামী বছর থেকে রপ্তানি শুরু করব। আম বেশি বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে। ১০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিভিন্ন জাতের বিদেশি আম বিক্রি করছি।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশি জাতের আমের চাহিদা বাড়ছে। তাই বাগান বাড়ানোর চেষ্টা করছি। বিদেশি জাতের আমের দামও বেশি পাওয়া যায়।’
রঙিন আমচাষি উমংচিং মারমা বলেন, ‘পরীক্ষামূলকভাবে রঙিন আম লাগিয়ে দেখেছি ভালো ফলন এসেছে, ভালো দামও পাচ্ছি। বাগানে রঙিন বিশ জাতের গাছ আছে। এর মধ্যে পাঁচটি জাতের গাছ বেশি লাগানো হয়েছে। বাগানে সব মিলিয়ে চার-পাঁচ শ গাছ আছে। দেশি আমের চেয়ে রঙিন আমে ভালো দাম পাওয়া যায়। তাই জেলার প্রায় বাগানে কম-বেশি রঙিন জাতের আম চাষ বাড়ছে।’
খাগড়াছড়ি ফলদ বাগানমালিক সমিতি আহ্বায়ক কালো বরণ চাকমা বলেন, ‘আমবাগান মালিকদের থেকে অবৈধভাবে অতিরিক্ত টোল আদায় করা হচ্ছে। টোল আদায় কমানো হলে আমাদের জন্য সুবিধা হবে।’
খাগড়াছড়ি মারমা ফলদ বাগানমালিক সমিতি লিমিটেডের আহ্বায়ক আবুশ্যি মারমা বলেন, ‘আমাদের সমিতিতে আশিজনের বেশি সদস্য আছে। সবার বাগানে কম-বেশি বিদেশি জাতের আমের চাষ হচ্ছে।’
খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মালেক জুয়েল বলেন, ‘খাগড়াছড়িতে ইদানীং কিছু রঙিন (বিদেশি) জাতের আম চাষাবাদ শুরু হয়েছে। সেগুলো নিয়ে আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলমান রয়েছে। উদ্ভিদের জার্মপ্লাজমগুলো সংগ্রহে রয়েছে। মূল্যায়নের মাধ্যমে আরও নতুন জাতের আম অবমুক্ত করতে পারব।’
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে খাগড়াছড়িতে বিদেশি জাতের আমের আবাদ শুরু হয়েছে। পালমার, মিয়াজাকি, ব্যানানা, চিয়াংমাই, কিউজাইসহ আরও জাত আছে। এগুলো চাষ হচ্ছে এবং চাষের এরিয়া দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবগুলো বাণিজ্যিক জাত হবে কি না বলতে পারছি না। দু-এক বছর যাওয়ার পরে বলতে পারব কোনগুলো বাণিজ্যিক জাতের আম হবে।’