‘খুব আঘাত পাইছি ভাই, মানুষ আর মানুষ নাই।’ কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকেও তীব্র শ্বাসকষ্টে কাতর লুৎফুন্নাহার বেগমকে ফিরিয়ে নেওয়ার পথে কথাগুলো বলছিলেন তাঁর জামাতা আবু সাঈদ। একে একে চারটি হাসপাতাল ঘুরে এসেছিলেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। সেখানেও ফাঁকা নেই আইসিইউ শয্যা। তাই ষষ্ঠ হাসপাতালের দিকে তাঁরা ছুটছেন। এই ছোটার পথে আবু সাঈদের ক্ষোভ যতটা না আইসিইউ না পাওয়ার জন্য, তারও চেয়ে বেশি প্রতারক চক্রের কারণে মূল্যবান আধ ঘণ্টা সময় নষ্ট হওয়ায়।
আইসিইউ পেতে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়েছিলেন আবু সাঈদ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর আইসিইউ পাওয়া হলো না। আবু সাঈদ বলেন, ‘মানুষের জীবন নিয়া মানুষ এমন করতে পারে! একটা মানুষ কষ্টে কাতরাইতাছে, আর দালালেরা আধ ঘণ্টারও বেশি ঘুরাইল।’
আজ শুক্রবার বেলা ১২টা ২০ মিনিট। রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশের সময়ও ধারণা ছিল না জরুরি বিভাগের সামনে কোন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়ানো একটি অ্যাম্বুলেন্স। ভেতরে অক্সিজেন মাস্ক পরা এক নারী শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ষাট বছর বয়সী এই নারীর নাম লুৎফুন্নাহার বেগম। তাঁর জন্যই আইসিইউ খুঁজছিলেন আবু সাঈদ।
আবু সাঈদ জানালেন সকাল থেকে তাঁদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া দুর্দশার কথা। সকালে হঠাৎ লুৎফুন্নাহারের নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে সকাল ৯টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠেন তাঁরা। এর পর পর্যায়ক্রমে রাজধানীর ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল, বেটার লাইফ হাসপাতাল, প্রশান্তি হাসপাতাল লিমিটেড, ইউনিটি হাসপাতাল ঘুরে আসেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। কোথাও আইসিইউর ব্যবস্থা করতে পারেননি। কোথাও আইসিইউ ব্যবস্থা ছিল না, আবার কোথাও খালি নেই। এদিকে কুর্মিটোলার জেনারেল হাসপাতালের ১০টি আইসিইউ শয্যাই ঝুঁকিতে থাকা করোনা রোগী দিয়ে পূর্ণ। তাই আবার তাঁকে ছুটতে হয়েছে গুলশানের সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে। এরই ফাঁকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।
মালিবাগ এলাকার প্রশান্তি হাসপাতাল লিমিটেড নামের একটি হাসপাতালের কথা উল্লেখ করে সাঈদ বলেন, ‘ওই হাসপাতালে আইসিইউ আছে কইয়া আমাদের এত নাজেহাল করল। এইটা সবচেয়ে আঘাত পাইছি। কিছু দালাল আমাদের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেইকাই ফলো করছে। এদের ছিল ট্যাকা খাওয়ার ধান্দা।’
আগে থেকেই কিডনি রোগে ভুগছিলেন লুৎফুন্নাহার। নিয়মিত সেবা নিতেন ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে। তাই শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ার পর পরিবারের লোকজন প্রথমে সেখানে নিয়ে যান তাঁকে। সেখানে ছিল না আইসিইউ। এমনকি অক্সিজেন সুবিধাও ছিল না সেখানে। করোনা মহামারির এমন দুঃসময়েও কিছু বেসরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, সরকারি হাসপাতালে উচ্চ সেবার অপ্রতুল ব্যবস্থার কারণে চার ঘণ্টা ধরে হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে তাঁকে।
নিশ্চয়তা না পাওয়ায় এক এক করে পাঁচটি হাসপাতালের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়েই ফিরে গেছে লুৎফুন্নাহারকে বহন করা অ্যাম্বুলেন্সটি। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে মুমূর্ষু লুৎফুন্নাহারের পাশে বসেছিলেন তাঁর মেয়ে ও মাথার কাছে বসেছিলেন তাঁর ছেলের স্ত্রী। কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকে ফিরে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তাঁর মেয়েকে অঝোরে কাঁদতে দেখা যায় এবং তাঁর ছেলের বউকে দেখা গেছে বেশ কিছুটা সময় ধরে তাঁর কানে সুর করে কিছু বলতে!