চলনবিল অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে ভাসমান বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেসকো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার-২০২৫ অর্জন করেছে বাংলাদেশের সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা। আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর এক হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের জন্য উদ্ভাবনী সাক্ষরতা উদ্যোগ বাস্তবায়নের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কারটি তুলে দেওয়া হয় এর উদ্ভাবক মোহাম্মদ রেজোয়ানের হাতে।
সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার ভাসমান বিদ্যালয় প্রকল্প একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত শিক্ষাব্যবস্থা, যা বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমি অঞ্চল চলনবিলের জলপথে শিক্ষাসহায়তা দিচ্ছে। দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে স্থানীয় শিশুদের জন্য নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন, বিশেষ করে বর্ষাকালে নদী-খাল উপচে পড়লে। এ প্রেক্ষাপটে শ্রেণিকক্ষের সব সুবিধাসম্পন্ন নৌকাভিত্তিক ভাসমান বিদ্যালয় নতুন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করছে।
বর্তমানে সিধুলাই ৫৬টি নৌকা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ২৬টি ভাসমান শ্রেণিকক্ষ, ১০টি ভাসমান গ্রন্থাগার ও কম্পিউটার ল্যাব এবং আটটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্য নৌকাগুলো স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা ও পরিবহন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয় নৌকা নির্মাণ জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নির্মিত প্রতিটি নৌকায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে।
সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার নির্বাহী পরিচালক স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, ‘স্থানীয় মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণকে ভিত্তি করেই টেকসই সমাধান গড়ে ওঠে। আমাদের বিশ্বাস, যে সমস্যার মুখোমুখি একটি সম্প্রদায় প্রতিদিন হয়, সেই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধানের ধারণাও প্রায়শই সেই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই আসে। এই স্বীকৃতি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করা অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে আরও মানুষের কাছে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা।’
ইউনেসকো ঢাকা আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় শিক্ষা পৌঁছে দিতে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের কার্যক্রম শুধু শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তিই বাড়ায় না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে সহায়তা করে। সরকার এ ধরনের কার্যকর উদ্যোগকে উৎসাহিত ও সম্প্রসারণে কাজ করছে।
সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার পাশাপাশি চলতি বছর ইউনেসকো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার-২০২৫ পেয়েছে আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল অ্যাডাল্ট লিটারেসি এজেন্সি (নালা) ও মরক্কোর শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
১৯৬৭ সাল থেকে সাক্ষরতা ক্ষেত্রে উৎকর্ষতা ও উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেসকো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার দিয়ে আসছে। চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় দেওয়া ইউনেসকো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কারের অর্থমূল্য ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। প্রতিবছর কার্যকর সাক্ষরতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং গ্রামীণ অঞ্চলের প্রাপ্তবয়স্ক ও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা তরুণদের শিক্ষায় সহায়তার জন্য বিশ্বের তিনটি প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
এর আগে বাংলাদেশ থেকে ফ্রেন্ডশিপ ২০২৩ সালে এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ২০১৩ সালে এই ইউনেসকো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার অর্জন করে।