বিলম্বের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন রেলপথ প্রকল্প। ইতিমধ্যে চার দফা মেয়াদ বাড়ানো এই প্রকল্প শেষ করতে আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। প্রায় এক যুগে প্রকল্পের কাজ হয়েছে ৫৪ শতাংশ।
ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয় ২০১৪ সালের জুনে। প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৩৭৮ কোটি ৬৫ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ৬৫৮ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার টাকায়। এই টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
প্রকল্প সূত্র জানায়, অনুমোদিত মূল প্রকল্প অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়নের মেয়াদকাল ছিল ২০১৪-২০১৭ সাল। ব্যয় একই রেখে প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুন করা হয়। দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত এবং তৃতীয় দফায় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। চতুর্থ দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। ব্যয়ও বাড়ানো হয়। এবার আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।
সূত্র জানায়, প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে দুই দফায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করতে হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন কাজ পায়। তবে সময়মতো সাইট বুঝিয়ে না দেওয়ার অজুহাতে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চীনা ঠিকাদার ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ প্রকল্প ছেড়ে চলে যায়। ওই বছরের ডিসেম্বরে রেলওয়ে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে। ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান জিপিটি ইনফ্রাস প্রজেক্ট লিমিটেড ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে চুক্তি হয়। জিপিটি-স্ট্যান্ডার্ড জয়েন্ট ভেঞ্চার ২০২৫ সালের ১৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের কাজ শুরু করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চীনা ঠিকাদার প্রকল্পের প্রায় ৪৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছিল। নতুন ঠিকাদার কাজ শুরুর পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৪ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ২ কিলোমিটার রেললাইন বসানো হয়েছে। রেললাইন বসানোর প্রস্তুতি হিসেবে বিভিন্ন স্থানে মাটি ভরাট, সেতু নির্মাণসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজ চলছে।
নতুন করে মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. সেলিম রউফ আজকের পত্রিকাকে বলেন, নতুন ঠিকাদারের কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক। তবে বর্ষা মৌসুমে প্রায় চার মাস কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত দুই বছরের বাড়তি সময়ের মধ্যে এক বছর থাকবে প্রকল্পের ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড হিসেবে।
এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন ও লুপ লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। আধুনিক সংকেত ব্যবস্থা স্থাপন, পাঁচটি স্টেশন ভবন (শ্যামপুর, পাগলা, ফতুল্লা, চাষাঢ়া ও নারায়ণগঞ্জে) নির্মাণ, প্ল্যাটফর্ম, চারটি পদচারী-সেতু, ১১টি ছোট সেতু, দুটি ওয়াশ পিট, একটি বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, শ্যালো ও ডিপ টিউবওয়েল, ট্রেনে পানি সরবরাহের জন্য হাইড্রেন্ট, ডরমিটরি ভবন এবং স্টাফ কোয়ার্টার ভবন নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্প সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ ২ নম্বর রেলগেট থেকে ১ নম্বর রেলগেট পর্যন্ত (চাষাঢ়া পর্যন্ত) প্রায় ৩২০ মিটার এলাকায় পাশাপাশি দুটি রেললাইন বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অধীনে থাকা সড়কের কিছু অংশ প্রয়োজন হলেও তা এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। ফলে এই অংশে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘প্রয়োজনীয় জায়গা না পেলে চাষাঢ়া থেকে নারায়ণগঞ্জ অংশে ডাবল লাইনের পরিবর্তে সিঙ্গেল লাইন রাখা হবে এবং সেটিকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে। তবে চাষাঢ়া থেকে ঢাকামুখী অংশ পুরোপুরি ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন হিসেবেই নির্মাণ করা হবে। তবে আমরা আশা করছি, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ১৬ শতক জমি আমাদের দেবে।’
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথে ১৮৮৫ সালে ১৪.৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ মিটারগেজ রেলপথ নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে এই রুটে দিনে ৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করে, যাত্রার সময় লাগে প্রায় ৪৫ মিনিট। নতুন রেললাইন তৈরি হলে ট্রেন চলাচল বাড়বে এবং যাত্রীদের যাতায়াত আরও সহজ ও দ্রুত হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, পরিকল্পনা, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো না হলে বিলম্ব ও অতিরিক্ত ব্যয় এ ধরনের প্রকল্পে নিয়মিত হয়ে যেতে পারে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে সমন্বয় বাড়িয়ে প্রকল্পকে নির্ধারিত সময়ে শেষ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।