জীবনের প্রায় শতবর্ষ পেরিয়ে বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন ছামেনা খাতুন। এই বয়সে সন্তানের স্নেহ-ভালোবাসা আর একটু আশ্রয়ের প্রত্যাশা থাকলেও তাঁর ভাগ্যে জুটেছে অবহেলা আর অনিশ্চয়তা। একমাত্র ছেলে বিদেশে থেকে নতুন বিল্ডিং নির্মাণ করলেও সেখানে স্থায়ী ঠাঁই হয়নি শতবর্ষী এই মায়ের। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তিনি বসবাস করছেন মেয়ের জরাজীর্ণ ঘরে। অভাব-অনটন আর অনাহার-অর্ধাহারে কাটছে তাঁর জীবন।
হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ছামেনা খাতুনের জন্ম ১৯৩১ সালের ২২ নভেম্বর। তাঁর তিন মেয়ে ও এক ছেলে। একমাত্র ছেলে ফয়েজ আহমেদ ২০০৬ সাল থেকে সৌদি আরবে কর্মরত। ২০০৮ সালে স্বামী আবদুল হকের মৃত্যুর পর থেকেই ছামেনা খাতুনের জীবনে নেমে আসে দুর্দশা।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১১ সালে ছেলে ফয়েজ আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী রুমা বেগম ছামেনা খাতুনের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাঁকে পাশের বাড়িতে থাকা মেয়ে রোকেয়া বেগমের কাছে পাঠিয়ে দেন। এর পর থেকেই মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
রোকেয়া বেগমের দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে ছোট একটি সংসার। সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি মায়ের দেখাশোনা করছেন। তবে একমাত্র ছেলে ফয়েজ আহমেদ মায়ের খোঁজখবর রাখেন না বলে অভিযোগ পরিবারের।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে ফেরেন ফয়েজ আহমেদ। গ্রাম্য মাতবর ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধে তিনি মাকে নিজের নতুন নির্মিত বিল্ডিংয়ে নিয়ে যান। কিন্তু গত ৪ মে তিনি পুনরায় সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার পরদিন ভোরে তাঁর স্ত্রী রুমা বেগম বৃদ্ধা ছামেনা খাতুনকে ওই ঘর থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রোকেয়া বেগম বলেন, ‘আমার ভাই বিদেশে থাকে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই মা অবহেলার শিকার। ২০১১ সালে জোর করে মাকে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমাদেরও অভাবের সংসার। তারপরও আমরা মায়ের ভরণপোষণ চালিয়ে যাচ্ছি। সমাজের লোকজনের অনুরোধে ভাই মাকে নিজের ঘরে নিয়েছিল। কিন্তু সে বিদেশ যাওয়ার পরদিনই ভাবি রাতের আঁধারে মাকে ঘর থেকে বের করে দেয়।’
শতবর্ষী ছামেনা খাতুন বলেন, ‘অনেক বছর আগে ছেলে আমাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। তারা আমার কোনো খোঁজখবর নেয় না। আমার মেয়েরাই আমাকে দেখাশোনা করে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মান্নান বলেন, ‘একজন শতবর্ষী মায়ের এমন দুর্দশা খুবই কষ্টের। ছেলের নতুন বিল্ডিং থাকলেও সেখানে তাঁর জায়গা হয়নি। যে মেয়ের বাড়িতে তিনি থাকেন, তাঁরাও অসহায়। জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বৃদ্ধা।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত রুমা বেগম সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আলকরা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল বশর বলেন, ‘বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। খোঁজখবর নিয়ে গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করব।’
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি আইন অনুযায়ী ছামেনা খাতুনের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’